ফেনীতে ৩২ কিশোর গ্যাং শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে
Printed Edition
ফেনী অফিস
ফেনী শহরে আবার ফিরে এসেছে কিশোর গ্যাং। শহরে নামে-বেনামে অন্তত ৩২টি গ্যাংয়ের তথ্য নিয়ে কাজ করছেন সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ ‘নাই’ হয়ে যাওয়া কিশোর গ্যাং গত কয়েক মাস ধরে তৎপর হয়ে উঠেছে। তাদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়া কিশোর-তরুণরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, নারী উত্ত্যক্ত, খুনোখুনিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করছে না। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে মারামারির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, ফেনী মডেল থানায় গত দেড় বছরে অন্তত আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩০-৩৫ জন গ্রেফতার হয়েছেন। দেড় শ থেকে দুই শ কিশোর-যুবক মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক আধিপত্য, ছোট ভাই-বড় ভাই এমনকি মেয়েসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। বিরোধের জের ধরে ‘রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাং গ্রুপ গড়ে তোলে। গত ৯ জানুয়ারি শহরের পাঠানবাড়ী এলাকায় একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় একটি মামলাও হয়। গত ১৮ জানুয়ারি শহরের রাজাঝির দীঘির পাড়ে ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মিনহাজ নামে এক শিক্ষার্থীকে ঘাড়ে কোপ দেয় কিশোরগ্যাং সদস্যরা। একই দিন কিশোরগ্যাংয়ের এক টিকটকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যাঙ্গ করে একটি কনটেন্ট পোষ্ট করে যা নিয়েও আলোচনার ঝড় উঠে। পুলিশ এদের চিহ্নিত করে আটক করতে অভিযান চালাচ্ছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ফেনী শহরে ‘কিশোর গ্যাং’ এর ৭ থেকে আটটি শক্তিশালী গ্রুপ রয়েছে। এদের বেশির ভাগ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। তবে সক্রিয় এমন ৩২টি গ্যাংয়ের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রয়েছে। এর মধ্যে এফবিএক্স-৩০, এমডিবি-১৯৬৪, এফসিবি-৭, এসআরডিএক্স, পিএক্স-১০, এমকেবি এক্স-১১, এফএক্স-১১, থ্রি আর ডিএক্স, এমবিডি-১৭৮, ডিকেবি, টক্সিন, সাইকো এক্সটেন, এসআরএক্স-২০, এফসিবি-২.০, এমডিবি-১৭৬, বিএসকেবি, জিকেবি-২৭, এসডিবি-২৬, এসিএক্স, রেডএক্স, এফসি সেভেন স্টার, আরকেবিএক্স ১১, এমএসবি, এইচপিজি, জেএসকেবি, এসএস-১০, এমসিকেএক্স-২০, টিআরবি ১৪৪ ও ১৪৩ এবং এমডিবি-৩৬০ উল্লেখযোগ্য। এসব গ্যাংয়ের প্রধান হিসেবে রায়হান, বিজয়, নোমান, নাফিজ বৃত্ত, ঠিকানা বাবু, নিলয়, ফাহিম, নাফিস মুন্সি, আরিফুল ইসলাম বাবু, হামিম, তানভীর, আবির, মাসুম, তাসিন, নিলয়, রাকিব, রাজু, পিয়ান্ত, পাবেল, পিয়ম, জাওয়াদ, তাহমিদ, এলেক্স জাহিদ, সাইদুল, রনি, সাইমুন, ইশতিয়াক, আব্দুর রহমান, অভি খান, সাব্বির, জুয়েল ও নিলয় প্রমুখ।
শহরের রেলওয়ে ষ্টেশন, রাজাঝির দীঘি ও পাইলট কেন্দ্রিক রায়হান, মিজান রোডে জুয়েল ও নিলয়, ফেনী পাইলট ও মিজান রোডে আবির, মিজান রোড ও আলিয়া মাঠকেন্দ্রিক মাসুম, ফেনী আলিয়া ও মিজান রোডে তানবির, শান্তি নিকেতন স্কুলের পাশের গলি ও রিকশা গেরেজের পাশের মাঠে হামিম, মুক্তবাজার ও ডাক্তারপাড়ায় তাসিন, ওয়াপদা মাঠ ও পাঠানবাড়ি এলাকায় নিলয়, ফেনী সেন্টারের সামনে রাজু, ফেনী সেন্টারের আশপাশে সাইমুন ও ইশতিয়াক, একাডেমি এলাকার ফারুক হোটেল ও বনানী এলাকায় আরিফুল ইসলাম বাবু, মমিন জাহান মসজিদ ও আড্ডা বাড়ি নাফিস মুন্সি, মমিন জাহান মসজিদে সাব্বির, পাঠানবাড়িতে অভি খান, ফালাহিয়া মাদরাসা ও আশপাশের এলাকা পিয়ান্ত, ডাক্তারপাড়া ও মুক্তবাজার এলাকায় আব্দুর রহমান, একাডেমি এলাকায় বিজয় ও এলেক্স জাহিদের সাঙ্গপাঙ্গরা নিয়মিত আড্ডা জমায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্র আরো জানায়, একসময় কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে থাকলেও এখন সেটি পরিবর্তন হয়েছে। এদের পেছনে এখন ছাত্রদল-যুবদল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬-৭ জন নেতার নাম ঘুরেফিরে আলোচনায়। জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন রিয়াদ পাটোয়ারীর নেতৃত্বে বড় একটি গ্রুপ রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম জানান, কিশোর গ্যাং নির্মুলে পুলিশ কাজ করছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে ছবি সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। মামলা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়।