হামে ২৪ ঘণ্টায় আরো ৭ শিশুর মৃত্যু আক্রান্ত সহস্রাধিক
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাম এবং হামের উপসর্গে আরো সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী নিশ্চিত হামে মারা গেছে দু’জন এবং ‘সন্দেহজনক হাম’ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরো পাঁচ শিশুর। এ নিয়ে গত ২৩ দিনে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২০ জন হলেও বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রের তথ্যে এই সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিশু বিশেষজ্ঞরা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার এবং আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া নিশ্চিত দুই শিশু ঢাকার বাসিন্দা। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৯৭ জন এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ জনের। বর্তমানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী (২৩৮ জন) ভর্তি রয়েছে। এরপরই রয়েছে যথাক্রমে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগ। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ২৩ দিনে মোট আট হাজার ৫৩৪ জন শিশু সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে এসেছে, যার মধ্যে ভর্তি হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৪০ জন।
তবে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে প্রাণহানির পরিসংখ্যানে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ২৩ দিনে ২০ জনের মৃত্যুর কথা বললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৬১ জন এবং সন্দেহজনক হামসহ এই সংখ্যা ১১৮ বলে জানা গেছে।
এ দিকে রাজশাহী ব্যুরো জানিয়েছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালটিতে হাম উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৪২ জনে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ১৩৮ জন শিশু ‘হাম সাসপেক্টেড’ হিসেবে ভর্তি আছে। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় একটি পুরো শিশু ওয়ার্ডকে ‘হাম আইসোলেশন ইউনিট’ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
অন্য দিকে সিলেট ব্যুরো জানিয়েছে, সিলেটে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রথমবারের মতো দুই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির নয়া দিগন্তকে জানান, শিশুটি হৃদযন্ত্রের জটিলতা ও হাম নিয়ে আইসিইউতে ভর্তি ছিল। সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ছয়জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ৪৪ জন সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওসমানী হাসপাতালে ১০ শয্যার আলাদা আইসোলেশন ইউনিট চালু করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশু কাশি দিলে জীবাণু বাতাসে দু-তিন ঘণ্টা বেঁচে থাকে এবং এর মাধ্যমে কমপক্ষে ৯০ জন সংক্রমিত হতে পারে। তবে সব শিশুকে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন নেই। যদি শিশু খেতে না পারে, শ্বাসকষ্ট হয়, খিঁচুনি ওঠে বা অচেতন হয়ে পড়ে, কেবল তখনই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। অন্যথায় ঘরেই চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা সম্ভব।
সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, শিশুর শরীরে লাল দাগ বা র্যাশ দেখা দেয়ার পরবর্তী চার দিন অত্যন্ত বিপজ্জনক। মায়ের শরীরের অ্যান্টিবডির কারণে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর হাম হয় না। কিন্তু বর্তমানে ৯ মাস হওয়ার আগেই শিশুরা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, যা উদ্বেগের বিষয়। হার্ট ফাউন্ডেশনের শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ডা: মো: আবু তালহা জানান, হামের কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এ ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। এটি মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
ভিটামিন ‘এ’ ডোজের নির্দেশনা : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী হাম আক্রান্ত শিশুর ডোজ নির্ধারণ করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় দিন ৫০ হাজার আইইউ করে মোট এক লাখ ইউনিট। ছয় থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুর জন্য পরপর দুই দিনে এক লাখ ইউনিট করে। ১২ মাস বা তার বেশি বয়সী শিশুর জন্য পরপর দুই দিনে দুই লাখ আইইউ করে। কারো চোখের সমস্যা থাকলে ২৪ সপ্তাহ পর আরো এক ডোজ দিতে হবে।
সুপারিশ ও সরকারি উদ্যোগ : এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা: মো: নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বক্তারা বলেন, ছোঁয়াচে এই রোগটি যেন অন্য শিশুদের মধ্যে না ছড়ায় সে জন্য প্রতিটি হাসপাতালে আলাদা বেড বা আইসোলেশন ইউনিট নিশ্চিত করতে হবে। ৯ মাসে টিকা দেয়ার পরও প্রাদুর্ভাবের সময় আবার টিকা দেয়া যাবে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে মসজিদের ইমাম ও কমিউনিটি লিডারদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া গণমাধ্যমে চিকিৎসকদের নেতিবাচক দিকের চেয়ে রোগ প্রতিরোধে তাদের পরিশ্রম ও গঠনমূলক পরামর্শগুলো বেশি প্রচারের অনুরোধ জানান সাংবাদিক নেতা মো: শহীদুল ইসলাম। সরকার দ্রুত এই সেমিনারের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করে সারা দেশে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনে ভ্যাকসিন কাভারেজ নিশ্চিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।