অর্থনৈতিক শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন
ইউনিট বেড়েছে ৫০ শতাংশ সবচেয়ে বেশি ঢাকায়
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
গত দশ বছরে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ৪৯.৬৮ শতাংশ বেড়েছে। দেশের পল্লী ও শহর উভয় এলাকায়ই অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ২৭.০৮ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট ঢাকায় এবং সর্বনিম্ন ৪.৬৭ শতাংশ সিলেটে অবস্থিত। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ এর ইউনিটসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ৪১.৮২ শতাংশ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান ও মোটরসাইকেল মেরামত খাতের অন্তর্ভুক্ত বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। শুমারির প্রতিবেদন বলছে, ইউনিটের মোট জনবলের ৭৭.৫৩ শতাংশ স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে।
রাজধানীর আগারগাঁয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অডিটোরিয়ামে অর্থনৈতিক শুমারির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এ তথ্য দেয়া হয়। ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: ফরহাদ সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, বিশেষ অতিথি পরিসংখ্যান সচিব আলেয়া আক্তার ও পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আহমেদ। উদ্বোধনী বক্তব্য ও সঞ্চালনা করেন এসআইডি যুগ্ম সচিব ও এ প্রকল্প পরিচালক ড. দিপঙ্কর রায়। প্রতিবেদন তুলে ধরেন প্রকল্পের উপপরিচলক মো: মিজানুর রহমান।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, একটি দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হলো নীতি-নির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রমাণনির্ভরতা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে ডাটা ড্রাইভেন প্লানিং এবং জনকেন্দ্রীক অর্থনৈতিক নীতি। সে প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর ফলাফল আমাদের অর্থনীতির একটি বিস্তৃত, গতিশীল এবং সম্ভাবনাময় চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালে দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ১৭ লাখের বেশি, যা ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪৯.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এ প্রবৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতির সম্প্রসারণ ও বহুমাত্রিক বিকাশের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। পল্লী ও শহর উভয় এলাকাতেই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে।
সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, দেশের কৃষি বহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহের সঠিক চিত্র তুলে ধরার লক্ষ্যে এ শুমারি পরিচালিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানার সংখ্যা, তাদের ধরন, প্রধান কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতি এবং শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, এ শুমারির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটসমূহের একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় পরিসংখ্যান পদ্ধতি (এনএসএস)-কে আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ ডাটাবেজ ও রিপোর্টের তথ্য নীতিনির্ধারক, পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী সমাজ, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
১০ বছরে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ১৭ লাখ দুই হাজার ৭৯২টি। যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। এখানে ‘অর্থনৈতিক ইউনিট’ বলতে মূলত এমন প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বা কার্যক্রমকে বুঝায় যা কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি হলো অর্থ উৎপাদন, সেবা প্রদান বা বাণিজ্যিক কাজের একটি একক ইউনিট।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী পল্লী এলাকায় মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি এবং শহর এলাকায় ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি। অন্য দিকে, ২০১৩ সালে পল্লী এলাকায় অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার ১৯টি এবং শহর এলাকায় ২২ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৬টি। সে বিবেচনায়, পল্লী এবং শহর উভয় এলাকাতেই অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে। মোট অর্থনৈতিক ইউনিট এক কোটি ১৭ লাখ দুই হাজার ৭৯২টির মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান ৬২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫৭টি (৫৩.৫৭ শতাংশ), অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯৬৯টি (৪.৯১ শতাংশ) এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানা ৪৮ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৬টি (৪১.৫২ শতাংশ)।
সর্বোচ্চ ইউনিট ঢাকায়, কম সিলেটে
বিভাগভিত্তিক উপাত্ত বিবেচনায় দেখা যায়, সর্বাধিক ২৭.০৮ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট ঢাকায় এবং সর্বনি¤œ ৪.৬৭ শতাংশ সিলেটে অবস্থিত। এ ছাড়া, চট্টগ্রাম ১৭.৫১ শতাংশ, রাজশাহী ১৪.৩৬ শতাংশ, খুলনা ১২.৭৩ শতাংশ, রংপুর ১১.৪১ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৬.৬৩ শতাংশ ও বরিশালে ৫.৬১ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিটের অবস্থান।
সংখ্যায় মাইক্রো ও কুটিরশিল্পের প্রাধান্য
সংখ্যা বিবেচনায় মাইক্রো ও কুটিরশিল্পের প্রাধান্য বেশি। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে মাইক্রো শিল্পের সংখ্যা ৫৬.৬৭ শতাংশ এবং কুটিরশিল্পের সংখ্যা ৩৮.৭৪ শতাংশ। এ ছাড়া, ক্ষুদ্র শিল্প ৪.২০ শতাংশ, মাঝারি শিল্প ০.৩১ শতাংশ এবং বৃহৎ শিল্প রয়েছে ০.০৮ শতাংশ। দেশের মোট স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যক্তিগত/পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার ২৪টি (৮৭.৩৬ শতাংশ)। এ ছাড়া, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ৪ লাখ ৬৯৬টি (৬.৩৯ শতাংশ)।
সরকারি ও বেসরকারি এক লাখ ৩৯ হাজার ১৯৪টি (২.২২ শতাংশ), প্রাইভেট লি. কো. এক লাখ ১৪ হাজার ৩৮৬টি (১.৮২ শতাংশ) এবং অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত ৯০ হাজার ৫২২টি (১.৪৪ শতাংশ) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বিবেচনায় সেবা খাতের প্রাধান্য বেশি। এখানে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটসমূহের মধ্যে সেবাখাতের অন্তর্ভুক্ত ইউনিটের সংখ্যা এক কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৩টি (৯০.০২ শতাংশ) এবং শিল্পখাতের ইউনিটের সংখ্যা ১১ লাথ ৬৮ হাজার ৩৪৯টি (৯.৯৮ শতাংশ)।
জনবল বেড়েছে ২৫.০৩ শতাংশ
বিবিএস বলছে, অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ অনুযায়ী দেশের সব অর্থনৈতিক ইউনিটে নিয়োজিত মোট জনবল তিন কোটি ছয় লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন। যা ২০১৩ সালে ছিল দুই কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জন। ফলে ২০১৩ সালের চেয়ে ২০২৪ সালে জনবল ২৫.০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৪ অনুযায়ী মোট জনবলের ৮৩.২৮ শতাংশ পুরুষ (দুই কোটি ৫৫ লাখ ১১ হাজার ৬৫২ জন), মহিলা ১৬.৭১ শতাংশ (৫১ লাখ ১৯ হাজার ২৭১ জন) এবং হিজড়া ০.০১ শতাংশ (এক হাজার ৭৩৮ জন)।
স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে জনবলের আধিক্য বেশি
অর্থনৈতিক ইউনিটে নিয়োজিত মোট জনবলের ৭৭.৫৩ শতাংশ স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে, ২.৫৪ শতাংশ অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানায় ১৯.৯৩ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান ও মোটরসাইকেল মেরামত খাতের বিস্তৃতি বেড়েছে।
অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ এর ইউনিটসমূহের মধ্যে সর্বাধিক ৪১.৮২ শতাংশ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান ও মোটর সাইকেল মেরামত খাতের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া অন্যান্য খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পরিবহন ও মজুত ২২.২২ শতাংশ, উৎপাদন খাত ৯.৫৭ শতাংশ এবং আবাসন ও খাদ্যসেবা কার্যক্রম ৮.১১ শতাংশ।