হাছান মাহমুদ ও শামীম ওসমানসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জ দাখিল
জুলাইয়ে চট্টগ্রাম-নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাণ্ড
Printed Edition
শাপলা চত্বর হত্যা, প্রতিবেদন দাখিলে ফের বাড়ল সময়
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথকভাবে এই দুই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল ও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রামের ঘটনায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ মোট ২২ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। এই মামলায় আগামী ১২ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও তার আগেই তদন্ত সংস্থা তাদের প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেয়। যাচাই-বাছাই শেষে রাষ্ট্রপক্ষ গতকাল আদালতে আনুষ্ঠানিক চার্জ দাখিল করে।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ছয়জনকে হত্যাসহ মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে মো: ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো: ফারুককে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে ১৮ জুলাই তানভীর সিদ্দিকী, মো: সাইমন ও হৃদয় চন্দ্রকে হত্যা এবং তৃতীয় অভিযোগে শতাধিক মানুষকে গুরুতর আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার উল্লেখযোগ্য অন্য আসামিরা হলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন, রেজাউল করিম চৌধুরী, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, মোহাম্মদ ফিরোজ, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, দেবাশীষ পাল দেবু, জমির উদ্দিন, আজিজুর রহমান, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ, সুমন দে ও তৌহিদুল ইসলাম। অভিযুক্তদের সবাই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।
অন্য দিকে, একই দিনে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল আগামী ১৯ এপ্রিল এই শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন।
প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান আদালতে জানান, এই মামলার ১২ জন আসামিই বর্তমানে পলাতক এমপি রয়েছেন। আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) নিয়োগসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য শুনানি শেষে আদালত নতুন এই তারিখ নির্ধারণ করেন।
এর আগে, গত ৪ মার্চ পলাতক আসামিদের হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং ১৯ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত। প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই এবং ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা-সাইনবোর্ড এলাকায় ১০ জনকে তথ্য গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে শামীম ওসমানসহ অভিযুক্ত সব আসামিই আগ্নেয়াস্ত্রধারী ছিলেন এবং এই প্রেক্ষাপটে তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
শাপলা চত্বর হত্যার প্রতিবেদন দাখিলে ফের বাড়ল সময়
এদিকে এক যুগ আগে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় আরো দুই মাস বাড়ানো হয়েছে। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য আগামী ৭ জুন পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। তিনি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরো দুই মাস সময়ের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন এবং আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করেন।
এদিন সকালে এই মামলায় গ্রেফতার ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ওই ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ করেছিলেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে করা এই অভিযোগে মোট ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক এমপি হাজী সেলিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, রথ্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, কমিটির সদস্য অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার, একাত্তর টিভির সাবেক সিইও মোজাম্মেল হক বাবু, সময় টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আহমেদ জোবায়ের, এবিনিউজ২৪ ডটকমের সম্পাদক সুভাষ সিংহ রায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খান, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ এবং এনএসআইয়ের মো: মনজুর আহমেদ। উল্লেখ্য, তাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই পৃথক মামলায় ইতোমধ্যে ফরমাল চার্জ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
কারাগারে ডিভিশন চাইলেন শাহরিয়ার কবির
এ দিকে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ‘হত্যার’ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে ডিভিশন চেয়ে আবেদন করেছেন একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
রোববার তার এ আবেদনের ওপর শুনানি হয়। তবে উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ট্রাইব্যুনাল কোনো নির্দেশ দেননি। শাহরিয়ার কবিরের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পিএম মেহদী হাসান। তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, আমার মক্কেল এক বছর সাত মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং সমাজের একজন মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তি। কারাবিধি অনুযায়ী বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে তিনি কারাগারে ডিভিশন পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে ডিভিশনের বিরোধিতা করে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম বলেন, আমাদের এ মামলায় দুই মাস আগে শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট (হাজিরা পরোয়ানা) জারি হয়েছে। তিনি ডিভিশন পেলে অন্যরা কেন পাবেন না? এ ছাড়া আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উচিত আগে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়া। সেখানে না পেলে তারা আদালতে আসতে পারেন।
সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিলকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি
এ দিকে একই মামলায় সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার এ অনুমতি দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল। অপর সদস্য হলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে গাজী এমএইচ তামীম আবদুল জলিল মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান। শুনানি শেষে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে যেকোনো একদিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত।