পুঁজিবাজারে ৩টি মৌলিক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে : বিএসইসি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের পুঁজিবাজারকে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে তিনটি মৌলিক সংস্কার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। রোববার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভায় এ তথ্য প্রকাশ করেন কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির মাল্টিপারপাস হলে এই মাসিক সমন্বয় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি বাজারের আইনি সংস্কার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিস্তারিত ও উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

কমিশনের সহকারী মুখপাত্র ও সহকারী পরিচালক মো: মোহাইমিনুল হক স্বাক্ষরিত এ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সভার মূল আলোচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক গঠিত পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটির সভাপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বাজারের বর্তমান প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে ওঠার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, শেয়ারবাজারের চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

তিনি এ ধরনের নিয়মিত সমন্বয় সভাকে একটি কার্যকর মেকানিজম হিসেবে অভিহিত করে বলেন, অংশীজনদের মতামত ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা গেলেই পুঁজিবাজারের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। সেই সাথে সমাপ্ত ২০২৫ বছরে সংস্কার কাজে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুততম সময়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্থির করার নির্দেশনা দেন।

বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ সভায় কমিশনের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের চিত্র তুলে ধরে জানান, শেয়ারবাজারের আইনিভিত্তিকে শক্তিশালী করতে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’, ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫’ এবং ‘পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’ পুঁজিবাজার সংস্কারের এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ ২০২৫ সালের মধ্যেই সফলভাবে শেষ করা হয়েছে। আইপিও শেয়ারবাজারের ‘হৃৎপিণ্ড’, নতুন পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলসের মাধ্যমে বাজারে ভালো মানের শেয়ার আসার পথ এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত। বাজার সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে এই আইনি কাঠামোর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়াতে হবে। একই সাথে বাজার সংস্কারে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার ধারাবাহিক সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন তিনি।

সভায় শেয়ারবাজারের আধুনিকায়নে বেশ কিছু কারিগরি ও কৌশলগত বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা, বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নতুন পণ্য বা ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবর্তন এবং রোড শোর মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ই-কে ওয়াই সি এর মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে অনলাইনে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বাজার সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এপিআই কানেকটিভিটি বৃদ্ধির বিষয়ে সভায় ঐকমত্য পোষণ করা হয়। এ ছাড়া বহুল প্রতীক্ষিত কমোডিটি এক্সচেঞ্জ দ্রুত চালু করা, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) রেজিস্ট্রেশন ও অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু এবং মার্জার ও এক্যুইজিশন প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া সভায় বাজারের গভীরতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানি এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও আস্থা ফেরাতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কাজের পরিধি আরো বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয় সভায়। বিশেষ করে বিনিয়োগ শিক্ষা প্রসারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার নতুন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টিতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাক্ষিক ভিত্তিতে বিনিয়োগ শিক্ষাবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের উদ্যোগের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।

সভায় বিএসইসির কমিশনার মু: মোহসিন চৌধুরী, মো: আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো: সাইফুদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, সিসিবিএল চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) মো: ওয়াহিদ-উজ-জামান, ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম, আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ এবং সিডিবিএলের এমডি মো: আবদুল মোতালেবসহ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএমবিএর শীর্ষ প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। সভার শেষে বিএসইসি চেয়ারম্যান শেয়ারবাজারের টেকসই সংস্কার ও উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ জানান এবং বাজারের শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশনের কঠোর অবস্থান নেয়ার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন।