চাঁদাবাজদের আড়াল করতেই কি জুলাই যোদ্ধার নামে মামলা
পুলিশের রিমান্ড আবেদনের ভাষা ঘিরে প্রশ্ন
Printed Edition
গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে ‘চাঁদাবাজ’ বানানোর অপচেষ্টা প্রকৃত চাঁদাবাজদের আড়াল করার কৌশল- এমন মন্তব্যের পর পুলিশের দাখিল করা রিমান্ড আবেদন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের পর কালিয়াকৈর থানার দায়ের করা চাঁদাবাজি মামলায় পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বর্ণনা ও বাস্তব ঘটনার মধ্যে গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার সন্ধ্যার পর জামিনে কারা মুক্ত হয়ে টঙ্গীর নিজ বাসায় ফেরার পর সুরভী ও তার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎকালে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর কারা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, তা জাতি জানে। অথচ সেই চক্রকে বাঁচাতেই পরিকল্পিতভাবে জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মামলা, রিমান্ড ও হয়রানি চালানো হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সুরভীর ঘটনায় গণমাধ্যমের একটি অংশ দায়িত্বশীল ভূমিকা না রেখে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে, যা আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এরই মধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে কালিয়াকৈর থানার মামলা সংক্রান্ত পুলিশের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন। সেখানে অভিযোগ আনা হয়েছে, সুরভী পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাদিকে সংবাদ দেয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে গিয়ে সহযোগীদের সহায়তায় অপহরণ, মারধর, অর্থ আদায়, বিকাশ ও নগদ থেকে টাকা আত্মসাৎ এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেছেন।
তবে আইনজীবী ও জুলাই যোদ্ধাদের দাবি, রিমান্ড আবেদনে সুরভীর বয়স ২০ বছর দেখানো হলেও বাস্তবে ১৭ বছরের কিছু বেশি। অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়েও তাকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে গ্রেফতার, কারাগারে পাঠানো এবং রিমান্ড চাওয়ার বিষয়টি আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, আসামিকে পুলিশ হেফাজতে নিলে টাকা উদ্ধারের ‘উজ্জ্বল সম্ভাবনা’ রয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেফতার সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে- গ্রেফতারের ১১ দিন পরও কেন আসামির প্রকৃত বয়স যাচাই এবং কেন এ পর্যন্ত কোনো অর্থ বা আলামত উদ্ধারের তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।
সোমবার দুপুরে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে আদালতপাড়ায় ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু হয়। রিমান্ড আদেশের পর প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় সুরভী চিৎকার করে বলেন, ‘কোনো তদন্ত ছাড়াই আমাকে রিমান্ড দেয়া হয়েছে। এটা বিচার নয়, নিপীড়ন।
পরবর্তীতে বিকেলে গাজীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিমান্ড আদেশ বাতিল করে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় তিনি গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্ত হন।
এদিকে মামলার বাদির বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মামলার আরজিতে উল্লেখিত তার মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়। অপর দিকে সুরভীর বক্তব্য জানতে গতকাল সকালে তার টঙ্গীর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, গেট ভেতর দিক থেকে তালাবদ্ধ। পরে অন্য একটি নম্বর থেকে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তিনি ক্লান্ত থাকায় ঘুমাচ্ছেন। দুপুর ও বিকেলে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালিয়াকৈর থানার মৌচাক ফাঁড়ির এসআই ওমর ফারুকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ফিক্সড ডায়ালে থাকায় বারবার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মামলাটি আমার এই থানায় যোগদানের আগেই রেকর্ড হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা কী, সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাই বিস্তারিত বলতে পারবেন। বিষয়টি সম্পর্কে আপনি যতটুকু জানেন, আমিও ততটুকুই জানি।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, রিমান্ড আবেদনের ভাষা, বয়স সংক্রান্ত বিভ্রান্তি এবং ঘটনার সময়রেখা বিবেচনায় মামলাটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় এটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়রানিমূলক মামলার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।