শিশুর কাশি হলেই ওষুধ সেবন নয়

Printed Edition
Niramoy-2
শিশুর কাশি হলেই ওষুধ সেবন নয়

ডা: আহাদ আদনান

মন্টিলুকাস্ট ওষুধটি বাজারে ৪, ৫ এবং ১০ মিলিগ্রাম পরিমাণে পাওয়া যায়। এটি মূলত বড়দের হাঁপানির ওষুধ। তাও আবার প্রথম পছন্দনীয় ওষুধ নয়। যখন প্রাথমিক ওষুধে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তখন চিকিৎসক এটি ব্যবহার করতে বলেন। শিশুদের ক্ষেত্রেও এটির সীমিত ব্যবহার আছে। একান্তই যখন প্রথম বা দ্বিতীয় পছন্দের ওষুধে হাঁপানি সারে না, তখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মন্টিলুকাস্টের ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। তাও আবার এটা পাঁচ বছর পূর্ণ হলে। সারাবিশ্বে শিশু হাঁপানির ‘গিনা গাইডলাইন’ অনুযায়ী পাঁচ বছরের নিচে এই ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে ছয় মাসের নিচের বাচ্চাকেও মুড়িমুড়কির মতো মন্টিলুকাস্ট দেওয়া হচ্ছে। ফার্মাসিস্ট, প্যারামেডিক্স থেকে শুরু করে অনেক চিকিৎসকই এই ব্যাপারটিকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যেটা আমাদের জন্য বিপদের কারণ হতে যাচ্ছে।

মন্টিলুকাস্ট শিশুদের কী সমস্যা করতে পারে

গবেষণায় নিচের কয়েকটি সমস্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

- শিশুদের ঘুমের কিছু সমস্যা হয়। নিদ্রাহীনতা, দুঃস্বপ্ন, ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে ওঠা, ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা বা কথা বলার সমস্যা হতে পারে।

- এই বাচ্চারা খিটখিটে, অতি-চঞ্চল, উগ্র ছটফটে, মনোযোগের ঘাটতি হতে দেখা গেছে।

- অনেকের বিষণœতা, অতি-উদ্বেগ হয়েছে।

- দুর্লভ কিছু ক্ষেত্রে হ্যালুসিনেশন (অবাস্তব দৃষ্টি), স্মৃতিশক্তি কমা, হাত-পা কাঁপাকাঁপি, আগে থেকে খিঁচুনি ছিল এমন বাচ্চার খিঁচুনি বেড়ে যাওয়া থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেছে।

মন্টিলুকাস্ট কাদের দেওয়া হয়

- মন্টিলুকাস্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নাকের পানি কমায় এবং যেহেতু হাঁপানিতে কিছুটা কাজ করে সেহেতু কাশি দমায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে কাশি কমালেও হাঁপানির উপশম এই বড়ির কাজ নয়। তাই অনেকেই নাকে পানি বা কাশি হলে, অন্তত প্রথম কিছু ওষুধে কাজ না করলেই এটি সেবন করতে বলেন।

- শিশুদের হাঁপানি সবচেয়ে নিরাপদ এবং স্বীকৃত ওষুধ বিভিন্ন ইনহেলার (স্টেরয়েড, সালবিউটামল বা কম্বিনেশন)। আমাদের দেশে অভিভাবকের এই ইনহেলার নিয়ে প্রচুর ভুল ধারণা, কুসংস্কার কিংবা অনীহা রয়েছে। তারা ইনহেলার কে প্রাথমিকভাবে বেশি খরচের ওষুধ মনে করে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদের কম খরচ, নগণ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের কথা বুঝতে চান না। পক্ষান্তরে তাৎক্ষণিক কম খরচ এবং খাওয়াতে সুবিধার কথা চিন্তা করে মন্টিলুকাস্ট তাদের খুবই প্রিয়।

- ওষুধ বিক্রেতাদের মন্টিলুকাস্ট বিক্রিতে অধিক মুনাফা, বারবার বিক্রির সুযোগ এবং অধিক কমিশন প্রাপ্তির সুযোগ থাকে।

- অনেক শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই ব্যাপারটি গুরুত্ব দেন না। মায়েদের কথায়, ওষুধ কোম্পানির প্ররোচনায় তারাও এই ‘আপাত’ সস্তা ওষুধ লিখে থাকেন।

- তাদের অনেকেই রোগীকে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ইনহেলারের উপকার, ব্যবহারবিধি শিখিয়ে দেওয়া এবং মন্টিলুকাস্টের ক্ষতির কথা অভিভাবককে বুঝিয়ে বলেন না। তাই অনেক রোগীকে ভালো উপদেশ দিলে বলে ‘অমুক’ ব্যস্ত, জনপ্রিয় অধ্যাপক ইনহেলার না দিয়ে মন্টিলুকাস্ট দিয়েছে, আপনি কি তার চেয়ে বেশি বুঝেন!

এখন কী করণীয়

- আমাদের সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। রোগীদের মন্টিলুকাস্ট সম্বন্ধে সঠিক ধারণা দিতে হবে।

- শিশুদের সঠিকভাবে হাঁপানি নির্ণয় করা কঠিন। ঘনঘন কাশি হয়, নেবুলাইজ করা লাগে, হাসপাতালে ভর্তি লাগে, ‘তথাকথিত’ বারবার নিউমোনিয়া হয় এমন রোগীদের শিশুদের ‘পালমনোলজি’ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (যারা হাঁপানি, অ্যালার্জি, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া প্রভৃতি নিয়ে কাজ করেন) দেখাবেন।

- শিশু স্বাস্থ্যের পাঠ্যপুস্তকে নাকে পানি বন্ধের ওষুধ (অ্যান্টি-হিস্টামিন) দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা ধৈর্য ধরলে একসময় আপনাআপনি সেরে যায়। ছয় মাসের নিচের শিশুদের বুকের দুধ নিজেই একটি এন্টিবায়োটিকের কাজ করে। এর পরবর্তী বয়সের শিশুকে কাশির জন্য কুসুম গরম পানি, মধু, লেবুর পানি, তুলসী বা বাসক পাতার রস, কালোজিরা, আদা-রঙ চা (ঠাণ্ডা করে সাত মাস হলেই দেওয়া যায়) বারবার দিতে পারেন। দোকানের কৃত্রিম রঙযুক্ত খাবার (জুস), অতিরিক্ত মশলা-লবণ (চিপস, কোঁকড়ানো নুডলস), অতিরিক্ত চিনি (কোল্ড ড্রিংকস, চকলেট) কাশি এবং হাঁপানি বাড়াতে পারে। এগুলো পরিহার করুন।

আমাদের মতো দেশে যেখানে এন্টিবায়োটিক চকলেটের মতো প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হয়, সেখানে মন্টিলুকাস্ট বিক্রি কতটা আটকানো যাবে, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। তাই যারা শিশুদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং ওষুধ বিপণনের সাথে জড়িত, তারা যেন অভিভাবককে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করি। ‘একটি শিশু একটি মন্টিলুকাস্ট’ চর্চা আমাদের ভয়াবহ বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং শিশু পালমনোলজিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, ফয়সল হাসপাতাল, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ