ইরানে হামলা নয় অবরোধ দীর্ঘ করার পরিকল্পনা ট্রাম্পের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ইরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এমনটি জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য- ইরানি রেজিমের অর্থভাণ্ডারকে আঘাত করা, যাতে তেহরানকে সেই পারমাণবিক সমঝোতায় বাধ্য করা যায়, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

গত সোমবার হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমের বৈঠকসহ সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেন ইরানের অর্থনীতি ও তেল রফতানির ওপর চাপ অব্যাহত রাখবেন। এ জন্য দেশটির বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার কৌশল নেয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মনে করেন তার অন্য বিকল্পগুলো, আবার বোমা হামলা শুরু করা বা পুরো সঙ্ঘাত থেকে সরে আসা এই অবরোধ বজায় রাখার তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এই অবরোধ চালিয়ে যাওয়া মানে সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া। এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনাও দুর্বল হয়েছে। একই সাথে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলও সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। ৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে বড় ধরনের বোমা হামলা বন্ধ করার পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার সঙ্ঘাত বৃদ্ধির পথ থেকে সরে এসেছেন। এর ফলে কূটনীতির জন্য কিছুটা জায়গা তৈরি হয়েছে, যদিও এর আগে তিনি ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন। তবু তিনি এখনো চান ইরানকে চাপে রাখতে, যতক্ষণ না তারা তার মূল দাবি- ইরানের সব পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা মেনে নিচ্ছে।

সোমবার ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেন, ইরানের তিন ধাপের প্রস্তাব, যেখানে প্রথমে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া এবং শেষ ধাপে পারমাণবিক আলোচনা করার কথা বলা হয়েছে, তা প্রমাণ করে তেহরান আন্তরিকভাবে আলোচনা করছে না।

এই মুহূর্তে ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চালিয়ে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। মঙ্গলবার নিজের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোস্যালে তিনি লেখেন, এই পদক্ষেপ ইরানকে ‘ধসে পড়ার অবস্থায়’ ঠেলে দিচ্ছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এই অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে স্পষ্টভাবে চাপে ফেলেছে, তারা বিক্রি না হওয়া তেল সংরক্ষণ করতেই হিমশিম খাচ্ছে এবং এর ফলে তেহরান নতুন করে ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধের একটি নতুন ধাপ নির্দেশ করে। এটি আরো দেখায় যে দ্রুত ও দৃশ্যমান জয়ের প্রতি ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এবার তার হাতে কোনো সহজ সমাধান নেই। যদি তিনি একতরফাভাবে যুদ্ধ থামিয়ে দেন, তাহলে দ্রুত সঙ্ঘাতের ইতি টানা সম্ভব এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কিন্তু গত সপ্তাহান্তে ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, সেই প্রক্রিয়ার শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা তেহরানের হাতেই থাকত।

অন্য দিকে আবার যুদ্ধ শুরু করলে দুর্বল হয়ে পড়া ইরান আরো চাপে পড়বে, কিন্তু একই সাথে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে, যা যুদ্ধের খরচ আরো বাড়িয়ে দেবে। অবরোধ ইরানের অর্থের জোগান কমিয়ে দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু এর মানে হলো মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য মার্কিন সেনা উপস্থিতি এবং তবু কোনো নিশ্চয়তা নেই যে ইরান শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করবে।

যুদ্ধ জয়ের নাটক সাজানোর ছক মার্কিন গোয়েন্দাদের

এ দিকে দুই মাস ধরে চলা যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং হোয়াইট হাউজের জন্য তা রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফা বিজয় ঘোষণা করলে ইরান কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। মার্কিন এই গোয়েন্দা তৎপরতার বিষয়ে অবগত একজন ব্যক্তি ও দেশটির দু’জন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনুরোধে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই প্রশ্নসহ আরো কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করছে। সূত্রগুলো বলেছে, ট্রাম্প যদি এই সঙ্ঘাত থেকে সরে আসেন, তাহলে তার প্রভাব কী হতে পারে সেটি বোঝাই এই পর্যালোচনার লক্ষ্য। তবে দেশটির কিছু কর্মকর্তা ও উপদেষ্টার আশঙ্কা, এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের হারের সম্মুখীন হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি এবং ট্রাম্প চাইলেই আবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারেন। তবে উত্তেজনা দ্রুত কমিয়ে আনলে তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর রাজনৈতিক চাপ কমাতে পারে। যদিও এর ফলে ইরান আরো সাহসী হয়ে উঠতে পারে; যারা শেষ পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনার খাতিরে সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই পর্যালোচনা কবে নাগাদ শেষ করবে সেটি পরিষ্কার নয়। তবে এর আগেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় ঘোষণার বিপরীতে ইরানের নেতাদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষণ করেছিল।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে প্রথম বোমা হামলা শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি বিজয় ঘোষণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চল থেকে সৈন্য সরিয়ে নেন, তাহলে ইরান সম্ভবত এটিকে নিজেদের জয় হিসেবে দেখবে। সূত্রটি আরো বলেছে, ট্রাম্প যদি বিজয় ঘোষণা করেও সেখানে বিপুল সৈন্য মোতায়েন রাখেন, তাহলেও এটিকে দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে দেখতে পারে ইরান; যা এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে কার্যকর ভূমিকা নাও রাখতে পারে।

এই খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অফিসের পরিচালক লিজ লিয়নস এক বিবৃতিতে বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থার কথিত এই মূল্যায়ন সম্পর্কে সিআইএ অবগত নয়। ইরান নিয়ে তাদের বর্তমান কাজ সম্পর্কে রয়টার্সের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সিআইএ। আর যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরের কার্যালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানিদের সাথে আলোচনার ব্যাপারে যোগাযোগ রাখছে এবং তাড়াহুড়ো করে কোনো খারাপ চুক্তিতে জড়াবে না। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট কেবল এমন একটি চুক্তিতেই সই করবেন; যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।

চুকতে হবে চড়া মাশুল

বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, ইরানের সাথে এই যুদ্ধ আমেরিকানদের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন এই সামরিক অভিযান তার ব্যয়ের তুলনায় সফল হয়েছে এবং মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ করেছে। গত কয়েক দিনে হোয়াইট হাউজের আলোচনার বিষয়ে অবগত অন্তত তিন ব্যক্তি বলেছেন, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এবং তার দলের ওপর এই যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ২০ দিন পার হলেও বহুমুখী কূটনীতি বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরান জাহাজগুলোতে আক্রমণ এবং প্রণালীতে মাইন বিছিয়ে এই সঙ্কীর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল পাম্পগুলোতে দাম বেড়ে গেছে। বাণিজ্যে বিঘœ ঘটানোর এই ক্ষমতা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার করে তুলেছে। ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তের সাথে অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে শেষ পর্যন্ত তেলের দাম কমে আসবে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো থেকে অনেক দূরে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

এখনো টেবিলে সামরিক বিকল্প

মার্কিন প্রশাসনের গতিবিধি সম্পর্কে অবগত অপর এক ব্যক্তি বলেছেন, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নতুন করে বিমান হামলাসহ বিভিন্ন সামরিক বিকল্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। তবে মার্কিন এক কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত অন্য এক ব্যক্তি বলেছেন, সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী বিকল্পগুলো যেমন ইরানের মূল ভূখণ্ডে স্থল অভিযান; কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন অনেক কম কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রেসিডেন্টের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপকে ‘‘বিশাল’’ বলে অভিহিত করেছেন। দেশটির একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের লাঞ্চার, গোলাবারুদ, ড্রোন এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে ইরান; যা যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বোমাবর্ষণে চাপা পড়েছিল। ফলে ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির শুরুর দিনগুলোর তুলনায় বর্তমানে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করার কারিগরি বা কৌশলগত ব্যয় অনেক বেশি।