নির্বাক রিজিয়া ৭ বছর পর ফিরে পেলেন পরিবার

সৌদি থেকে নারীরা ফিরছেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিবারের সাথে রিজিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ২০২১ সালে। পরিবারের সদস্যরা জানেন না এরপর রিজিয়া কেমন ছিলেন। তবে তাকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনতে তারা জনশক্তি রফতানি ব্যুরো, প্রেরণকারী এজেন্সি ও দালালসহ বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু তারা রিজিয়ার কোনো সন্ধান পাননি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সেই রিজিয়া একটি বিমানে করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কাছে হস্তান্তর করে। ১৩ দিন সেখানেই ছিলেন রিজিয়া। বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির সহায়তায় আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, রিজিয়ার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে, তিন সন্তানের জননী। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন রিজিয়া বেঁচে নেই।

গতকাল উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে রিজিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে সৌদি আরব থেকে ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়ে ফেরত আসা আরেক নারী রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের নিপীড়নের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এনায়েত হোসেন মান্নান, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সহকারী রাকিবুল হাসান ভূঁঞা, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম এবং সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) কর্মকর্তা মাহবুব আলম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান রিজিয়া বেগম। এভসেক কর্মকর্তা বিমানবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার মাহবুব আলম অনুষ্ঠানে জানান, ওই সময় তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অসংলগ্ন ছিল, নিজের ঠিকানা বা পরিবারের কোনো তথ্য জানাতে পারছিলেন না।

ব্র্যাক জানিয়েছে, রিজিয়ার কাছে কোনো পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত নথিপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে তার পরিবার খুঁজে পেতে নানা প্রচেষ্টা চলছিল। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার করা হয়। এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) খুলনা অঞ্চলের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন ব্র্যাকের সাথে যোগাযোগ করেন। পরে ঢাকায় পিবিআই সদস্যরা রিজিয়ার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে মিলিয়ে নিশ্চিত হয় যে তার বাড়ি মৌলভীবাজারে বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে। এরপর ব্র্যাক ওই গ্রামে গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজে বের করে।

পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, অপরাধী শনাক্তকরণে পিবিআই কাজ করলেও দেশের বাইরে থেকে আসা ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীদের পরিচয় শনাক্তকরণে পিবিআই এ প্রথম কাজ করলো। ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতিতে পিবিআই ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং যাদের কারণে বিদেশে নারীদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হয় সে পাচারাকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

রিজিয়ার মেয়ে লিজা আক্তার জানান, ২০১৯ সালে গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার এটিবি ওভারসিজ লিমিটেডর এজেন্সির সহায়তায় তার মা সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। দালাল ও সংশ্লিষ্টদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানালেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। বরং ২০২১ সালের পর মায়ের সাথে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। সোমবার ব্র্যাক সদস্যরা বাড়িতে আসলে জানতে পারেন তার মা ফিরেছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিজা বলেন, নির্যাতনে মায়ের এমন চেহারা হয়েছে যে, চিনতেই পারছেন না। আর তার মাও কোনো কথা বলছেন না।

অনুষ্ঠানে রিমা আক্তার নামে সৌদি ফেরত আরেক নারী তার নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ছোটবেলায় মা-বাবা হারিয়ে এতিমখানায় বড় হন। পরে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন এবং বিয়ে হয়। দুই সন্তানের জন্মের পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে তাকে চারবার বিক্রি করা এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফেরেন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তার নিরাপদ আবাসন ও চিকিৎসার জন্য এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ তাকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে। মানব পাচারের শিকার এ নারী এখন নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফেরা রিমা বা রিজিয়ার মতো নারীদের দুর্দশা দেখার কেউ নেই। নিপীড়নের পর বা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু যাদের কারণে এ দশা তাদের কোনো বিচার হয় না। আবার দেশে ফেরত আসলেও বিমানবন্দরে কোনো এসওপি না থাকায় এমন নারীদের নিয়ে কোনো দফতর কী করবেন বুঝে উঠতে পারে না। সৌদি ফেরত নারীদের এমন অসহায়ত্বের ঘটনাগুলো আমাদের ভীষণ বেদনার্ত করে। এগুলো বন্ধ করতে হবে।