টেক্সটাইল দূষণ রোধে বুটেক্স গবেষণায় বৈপ্লবিক উদ্ভাবন

বর্জ্য ডাই থেকে তৈরি হবে প্রসাধনী ও ওষুধের কাঁচামাল

Printed Edition
3rd
বুটেক্সের গবেষক দল : নয়া দিগন্ত

বুটেক্স প্রতিনিধি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি টেক্সটাইল শিল্প। তবে এই শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি বা ‘ইফ্লুয়েন্ট’ দেশের নদী-নালা, খাল-বিল ও সামগ্রিক বাস্তু সংস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিকভাবে যখন এই সঙ্কট মোকাবেলায় কার্যকর ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির অনুসন্ধান চলছে, তখন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)-এর একদল গবেষক সম্ভাবনার নতুন দিক উন্মোচন করেছেন।

টেক্সটাইল খাতে ব্যবহৃত রঙের মধ্যে ক্ষতিকর এজো ডাইয়ের ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ। ডায়িং প্রক্রিয়া শেষে এ ডাই-যুক্ত বর্জ্য পানি প্রায়ই সরাসরি পরিবেশে নিঃসৃত হয়। ফলে নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হয়, মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি ঘটে, কৃষি জমির উর্বরতা কমে যায় এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বহু বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এজো ডাই দূষণ নিয়ন্ত্রণে গবেষণা হলেও কার্যকর ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সমাধান এখনও সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে বুটেক্সের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মোহাম্মদ আজমল মোর্শেদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বুটেক্সের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় বিশেষ কেটালিস্ট ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিকর এজো ডাই ভেঙে বর্ণহীন ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর অ্যারোমেটিক অ্যামিন ও অ্যালকোহলে রূপান্তর করা হয়। উৎপাদিত উপাদানগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে প্রসাধনী ও ওষুধ শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব- যা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের একটি কার্যকর উদাহরণ।

গবেষণায় সহযোগিতা করেন ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: মোতাকাব্বির হাসান। গবেষক দলে আরো ছিলেন ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো: রফিকুল ইসলাম, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইস্তেখারুল অনয়, রসায়ন বিভাগের ল্যাবের কারিগরি কর্মকর্তা মো: কামারুজ্জামান এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ডুয়েট)-এর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী জীবন কুমার মোহান্তা।

গবেষণা উদ্যোগটির পরিকল্পনা ও প্রেরণা আসে ড. আজমল মোর্শেদের কাছ থেকেই। টেক্সটাইল শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দেশে এজো ডাইয়ের ডিগ্রেডেশন ও পুনঃব্যবহার নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা আগে খুব বেশি দেখা যায়নি। গবেষক দলটি ডাইয়ের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে একটি কার্যকর প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে, যা পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি শিল্পে টেকসই কাঁচামাল ব্যবহারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

গবেষণায় ‘ফেন্টন অ্যাডভান্সড অক্সিডেশন প্রসেস’ প্রয়োগের মাধ্যমে বর্জ্য শোধন প্রক্রিয়া আরো কার্যকর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রার সারফ্যাক্ট্যান্ট ব্যবহারে পানি শোধনের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সহকারী অধ্যাপক মো: মোতাকাব্বির হাসান বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি যে ‘রেফন্টন অ্যাডভান্সড অক্সিডেশন প্রসেস’ ব্যবহার করে বর্জ্য শোধন প্রক্রিয়াকে কয়েক গুণ শক্তিশালী করা সম্ভব।

নির্দিষ্ট মাত্রার সারফ্যাক্ট্যান্ট ব্যবহারের ফলে পানি শোধনের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নদী ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

কেমিস্ট্রি বিভাগের টেকনিক্যাল অফিসার মো: কামারুজ্জামান বলেন, ‘ডাই ডিগ্রেডেশন কাইনেটিকস নিয়ে এই কাজটি একেবারেই নতুন।

গবেষণার অধিকাংশ বিক্রিয়া বুটেক্সের কেমিস্ট্রি ল্যাবেই সম্পন্ন হয়েছে।’ তবে গবেষণার পথ সহজ ছিল না।

ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো: রফিকুল ইসলাম জানান, ‘শিল্পকারখানা থেকে বর্জ্য নমুনা সংগ্রহে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠানের অনীহা ছিল।

পাশাপাশি ল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু নমুনা বাইরে বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। তবুও নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছি।’

ইস্তেখারুল অনয় বলেন, ‘যথাযথ দিকনির্দেশনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও গবেষণার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বুটেক্সের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।’ তার মতে, সীমিত সুবিধার মধ্যেও মানসম্মত গবেষণা সম্ভব।

জীবন কুমার মোহান্তা মনে করেন, ‘এ ধরনের গবেষণা দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

স্বল্প সুবিধার মধ্যেও ভালো গবেষণা অসম্ভব নয়- বর্তমান প্রকল্পটি তার প্রমাণ।’

ড. আজমল মোর্শেদ বলেন, ‘এই কাজের সাফল্য দেশে গবেষণার মান বৃদ্ধিতে নতুন দিক উন্মোচন করবে।

শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ দিলে টেক্সটাইল খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।’

গবেষণার এই সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছে।

আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (এসিএস)-এর জার্নাল এসিএস ওমেগা-তে ১৬ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রটি ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে। এটি দেশের টেক্সটাইল গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বুটেক্স গবেষকদের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের গবেষণা সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতা করার যোগ্য।

তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে শিক্ষা ও গবেষণা কাঠামোয় আরো বিনিয়োগ, আধুনিক ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগই পারে আগামীর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে- যারা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মর্যাদা আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে।