ঢাকা-৮ এর লড়াই : পুরনো ক্ষমতা না নতুন রাজনীতির ডাক

Printed Edition

হারুন ইসলাম

রাজধানীর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা-৮ সংসদীয় আসন বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর থানা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১৮১ নম্বর এই আসনটি কেবল একটি নির্বাচনী এলাকা নয়; বরং এটি ঢাকার ক্ষমতা-কেন্দ্রের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়সংলগ্ন এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দফতর এই আসনের ভেতরে পড়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই আসনটির গুরুত্ব আলাদা করে চোখে পড়ে।

এই আসনে ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজপথের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত— সব কিছুর প্রতিফলন ঘটে। ফলে ঢাকা-৮ বরাবরই ‘হেভিওয়েট আসন হিসেবে পরিচিত।

প্রার্থীর ভিড়, তবে মূল লড়াই দুই শিবিরে

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে মোট আটজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। তারা হলেন- বিএনপির মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাসদের এ এফ এম ইসমাইল চৌধুরী, জাতীয় পার্টির মো: জুবের আলম খান, মুক্তিজোটের মো: রাসেল কবির, বাসদ (মার্কসবাদী)-এর এ এইচ এম রফিকুজ্জামান আকন্দ, ইসলামী আন্দোলনের কেফায়েত উল্লাহ এবং গণঅধিকার পরিষদের মেঘনা আলম।

তবে একাধিক প্রার্থী থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় ভোটারদের মতে, বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হয়ে এসেছে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের মধ্যে। অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির প্রতীক মির্জা আব্বাসের বিপরীতে এবার মাঠে নেমেছে নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য ও রাজপথের নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বের দাবি।

মির্জা আব্বাস : পুরনো ঘাঁটি ও প্রতিষ্ঠিত প্রভাব

শাহজাহানপুরের স্থায়ী বাসিন্দা মির্জা আব্বাস ঢাকা-৮ আসনের রাজনীতিতে বহুদিনের পরিচিত মুখ। পূর্বে ঢাকা-৬ নামে পরিচিত এই আসন থেকে তিনি চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া অবিভক্ত ঢাকার মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব, সব মিলিয়ে মির্জা আব্বাস এখনো এই আসনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত।

ঢাকা-৮ আসনের বিভিন্ন এলাকার ভোটার ও বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে একটি মিলিত চিত্র, এই আসনে রাজনীতি মানেই পরিচিত নাম, পুরনো নেতৃত্ব এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যা। অনেক ভোটারই বলছেন, নির্বাচন ঘিরে উত্তাপ থাকলেও বাস্তব জীবনের সঙ্কটগুলো বছরের পর বছর একই রয়ে গেছে।

তফসিল ঘোষণার পর জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে মনোনয়ন সংগ্রহের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তফসিল-পূর্ব প্রচারণার সুযোগ পাননি পাটওয়ারী। ফলে এলাকায় তার পোস্টার, ব্যানার ও সরাসরি জনসংযোগ তুলনামূলক কম ছিল।

মতিঝিল এজিবি কলোনির বাসিন্দা ও সদ্য স্নাতক নাজমুল হাসান জিসান বলেন, এই আসনে মির্জা আব্বাস ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীকে সমানভাবে চেনা কঠিন। ‘ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের মতো পরিচিত রাজনীতিবিদ আর কেউ নেই। তিনি বহু বছর ধরে এই এলাকায় রাজনীতি করছেন। ভোটাররা তাকে চেনে, তার নাম জানে। নির্বাচন এলেই তার পোস্টার-ব্যানার চোখে পড়ে। তবে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী এখন লাইমলাইটে আসছেন। তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে আমার মনে হয় বিএনপি নেতাকর্মীদের কারণে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের ভোটে হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।’

তবে জিসান জানান, নতুন প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সম্পর্কে এলাকাবাসীর জানাশোনা তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আমি এনসিপির নেতা হিসেবে চিনতাম, কিন্তু তিনি যে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী হয়েছেন- এটা আগে জানতাম না। তবে প্রচারণার পর তার ভালো পরিচিতি বেড়েছে। বিশেষ করে চাদাবাজদের বিরুদ্ধে বলার কারণে তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।’

শাহজাহানপুর এলাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসায়ী ফিরোজ বলেন, স্থানীয় রাজনীতিতে মির্জা আব্বাসের প্রভাব এখনো স্পষ্ট। আব্বাস সাহেব শাহজাহানপুরের নেতা। এখানে রাজনীতিতে তার কথার গুরুত্ব আছে। বহু বছর ধরে তাকে দেখছি।’ তবে ফিরোজ মিয়া মনে করেন, ভোটারদের বড় অংশ এখন আর শুধু নাম দেখে ভোট দিতে চায় না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের চাওয়া খুব সাধারণ চাঁদাবাজি বন্ধ হোক, ব্যবসা যেন নিরাপদে করতে পারি। কে নেতা, সেটা বড় কথা না; কাজটা করবে কি না, সেটাই আসল।’

এই আসনের অনেক ভোটার আবার বলছেন, এবারের নির্বাচনে মাঠে নতুন মুখ থাকলেও প্রচারণার দিক থেকে তেমন বৈচিত্র্য চোখে পড়েনি। পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় বসবাসরত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার পর মূলত বিএনপি ও জামায়াতের পোস্টার-ব্যানারই বেশি দেখা গেছে।

বাংলামোটর এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় কেয়ারটেকার দুলাল মিয়া বলেন, নির্বাচন ঘিরে এলাকায় আলাদা এক আমেজ তৈরি হয়েছে। আমি এই এলাকার ভোটার না, কিন্তু আমাদের গলিতেই আড়াই শ’র বেশি ভোটার আছেন। প্রায় প্রতি দিনই কেউ না কেউ ভোট চাইতে আসেন। তবে তফসিল ঘোষণার পর আর কাউকে বাসায় আসতে দেখিনি।’

ভোটারদের বড় অংশের সাথে কথা বলে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, তা হলো যানজট, ফুটপাথ দখল ও চাঁদাবাজি। এই তিনটি সমস্যাই বছরের পর বছর ধরে এলাকাবাসীর নিত্য ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে।

তরুণ ভোটার নাজমুল হোসাইন বলেন, এই এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। ফুটপাথ দখল করে দোকান বসানো হয়, রাস্তার ওপর হকার বসে। এর সাথে চাঁদাবাজিও জড়িত।’

ব্যবসায়ী সাবু মিয়া বলেন, ‘ফুটপাথ দখল আর চাঁদাবাজির কারণে স্বাভাবিক ব্যবসা করা কঠিন। অনেক সময় ভয় কাজ করে।’ কয়েকজন তরুণ ভোটার আবার বলছেন, তারা নতুন নেতৃত্ব দেখতে আগ্রহী হলেও পরিচিত মুখের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় আছেন।

শাহজাহানপুরের এক তরুণ ভোটার বলেন, নতুনদের কথা ভালো শোনায়, কিন্তু তারা জিতলে আদৌ কাজ করতে পারবে কি না, এই সন্দেহটা থাকে।

মির্জা আব্বাসের বিপরীতে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন নন, তবে ঢাকা-৮ আসনের ভোটারদের কাছে এখনো অনেকটাই নতুন মুখ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি পরিচিত হলেও মাঠের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ঢাকা-৮ কোনো ব্যক্তির জমিদারি নয়। এখানে শুধু পুরনো ও হেভিওয়েট নামই থাকবে, এমন নয়। মানুষ এখন নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অনেকে আমাকে ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে চেনে। নির্বাচনী প্রচারণার মধ্য দিয়েই ভোটারদের সাথে সরাসরি পরিচয় তৈরি হবে। আমি কোনো প্যারাশুট ক্যান্ডিডেট নই; রাজপথ থেকে উঠে আসা গণমানুষের প্রতিনিধি।’

এ বিষয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে আমাদের লক্ষ্য দেশের উন্নয়ন ও জনগণের ভালো-মন্দ। সেই লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচিত হলেও এই লক্ষ্য থাকবে, না হলেও থাকবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

প্রচারণা, জোট রাজনীতি ও মাঠের উত্তাপ

তফসিল ঘোষণার পর ঢাকা-৮ আসনে প্রচারণা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে প্রার্থীদের ওপর হামলা, প্রচারণায় বাধা এবং সংঘর্ষের অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করেছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরগুলো।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেন, জামায়াতের প্রার্থী ড. হেলালউদ্দিন তার পক্ষে সরে দাঁড়ানোয় জোটের সাংগঠনিক শক্তি বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সাথে সরাসরি কথা বলা এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করাই আমাদের মূল কৌশল।’

অন্য দিকে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের প্রচারণা নির্ভর করছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের ওপর।

ভোটারদের চোখে প্রধান সমস্যা

ঢাকা-৮ আসনের ভোটারদের সাথে কথা বলে উঠে এসেছে তিনটি বড় সমস্যা।

ভয়াবহ যানজট, ফুটপাথ দখল এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি। মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ এলাকায় প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াতের কারণে যানজট নিত্যদিনের সাথী। ফুটপাথ ও সড়ক দখল করে অবৈধ দোকান বসানোয় পথচারী ও ব্যবসায়ীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘আমরা চাই চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা। নিরাপদে ব্যবসা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।’

প্রতিশ্রুতি বনাম অভিজ্ঞতা

এলাকার সমস্যা সমাধান নিয়ে দুই প্রধান প্রার্থীর বক্তব্যেও পার্থক্য স্পষ্ট।

বিএনপির প্রচারণায় মির্জা আব্বাস বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে জনগণের ভালো-মন্দই আমাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য।’

অন্য দিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নির্বাচিত হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সংস্কার, হকার পুনর্বাসন এবং রাজনৈতিক চাঁদাবাজি বন্ধ করাই হবে আমার প্রথম কাজ।’

এই নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন দাঁড়িয়েছে অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে পরিবর্তন, রাজপথের রাজনীতি ও নতুন নেতৃত্বের বার্তার লড়াই হিসেবে। ভোটাররা শেষ পর্যন্ত পরিচিত মুখের অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেন, নাকি নতুন রাজনৈতিক ভাষ্যকে সুযোগ করে দেন, সেই দিকেই তাকিয়ে আছে রাজধানীর রাজনৈতিক মহল।