নতুন সরকারের কাছে স্বচ্ছ ও গতিশীল পুঁজিবাজারের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
নির্বাচনে জিতে যে দল বা জোটই ক্ষমতায় আসুক তাদের কাছে একটি স্বচ্ছ ও গতিশীল পুঁজিবাজার চান সংশ্লিষ্টরা। দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় অনেকটা স্থবির হয়ে পড়া পুঁজিবাজার আবার স্বাভাবিক ও গতিশীল হয়ে উঠুক এটাই চাওয়া তাদের। বিগত সরকারের আমলে একের পর এক বিপর্যয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, নতুন সরকার পুঁজিবাজারকে যথার্থ গুরুত্ব দিয়ে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে পারলে তারা তাদের হারানো লোকসানের কিছুটা ফিরেও পেতে পারেন। তা ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেলে বাজারে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হবেন।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের একীভূতকরণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন শূন্য ঘোষণার পর পুঁজিবাজার পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। উল্লিখিত ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মূলধনের একটি বড় অংশই সঙ্কটে পড়ে যায়, যা বাজার পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটায়। এর পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে। ধারাবাহিক দরপতনের ফাঁদে পড়ে যায় পুঁজিবাজার। এ সময় বিনিয়োগকারীদের মূলধনের একটি বড় অংশই লোকসানের মুখে পড়ে।
দীর্ঘ পতনের ধারাবাহিকতা কাটিয়ে এ বছরের শুরু থেকে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইনি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে থাকে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মার্জিন রুলস সংশোধন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিমালা সংশোধন ও আইপিও রুলস সংশোধন। এই তিনটি বড় মাপের সংশোধনী দিনের শুরুতে বাজারে কিছুটা নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হলেও ধীরে ধীরে স্টেক হোল্ডারদের পক্ষ থেকে তা ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে উল্লিখিত সংশোধনীগুলোর বিষয়ে সব স্টেক হোল্ডারের মতামত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা চাওয়া হলে সবাই তাতে সায় দেয়। আর এভাবে চলতি বছরের শুরু থেকে কিছুটা গতি ফিরে পায় পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ফিরে আসে স্বস্তি। তাই বিনিয়োগকারীরা মনে করেন নতুন সরকারের উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
২০২৫ সালের ২৮ মে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সেেচঞ্জর (ডিএসই) সবগুলো সূচক নেমে আসে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন অবস্থানে। ওই দিন ডিএসই’র প্রধান সূচক ডিএসইএক্স অবস্থান করছিল চার হাজার ৬১৫ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। বাজার মূলধন নেমে আসে ছয় লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকায়। একই দিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৬৪ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেও বাজার তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পায়নি। গত বছরের শেষদিন তথা ৩০ ডিসেম্বর ডিএসই’র প্রধান সূচকটির অবস্থান ছিল চার হাজার ৮৬৫ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে। ওই দিন বাজারে মোট লেনদেন ছিল ৩৫৪ কোটি টাকা।
তবে গত দেড় মাসেরও কম সময়ে পুঁজিবাজার পরিস্থিতির কমবেশি উন্নতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। এ সময় ডিএসই’র প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটেছে ৫৩৪ দশমিক ৬০ পয়েন্ট। গত বুধবার সর্বশেষ কর্মদিবসে সূচকটির অবস্থান ছিল পাঁচ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে। একই আচরণ ছিল বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের। দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ’র এ সময় উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২০৫ দশমিক ৩৯ ও ৯৬ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট। সূচকের এ উন্নতির ফলে ডিএসই’র বাজার মূলধন পৌঁছে যায় সাত লাখ আট হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়, যা গত বছরের শেষদিনে ছিল ছয় লাখ ৭৮ হাজার ১৮২ কোটি টাকায়। একই সময়ে ৩৫৪ কোটি টাকা থেকে ডিএসই’র লেনদেন পৌঁছে যায় ৭৯০ কোটিতে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে বাজার পরিস্থিতির আরো উন্নতি ঘটবে এটাই প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের।
বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের মূল শক্তি বিনিয়োগকারীরা। দীর্ঘ মন্দার কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি পুরোপুরি আস্থা হারাতে বসেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। সম্প্রতি বাজার আচরণের পরিবর্তনের ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে হলেও বাড়ছে। গত কয়েকদিনের পুঁজিবাজার আচরণই তার প্রমাণ। ইতোমধ্যে বাজারে কিছু কিছু সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যা সামনের দিনগুলোতে বাজারের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তাই এ মুহূর্তে দরকার বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে তাদেরই এটাই একমাত্র চাহিদা। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে নতুন নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারে ঢুকবে। আবার প্রাণ ফিরে পাবে পুঁজিবাজার। এর ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যেমন পুঁজিাবাজারকে বিনিয়োগের একটি ভালো মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে পারবে তেমনি উদ্যোক্তারাও ব্যাংকের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে উৎসাহিত হবে।