মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলও ভারতের হাতছাড়া হলো

ব্যাপক বিনিয়োগ চীনের

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

মিরসরাইয়ের পর ভারতের হাতছাড়া হলো মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখন মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে চীন। দেশটি একই সাথে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের কাজে হাত দেবে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ডেভেলপার ও ভূমি ইজারা চুক্তি সই হয়েছে। এ ছাড়া চীনের বেসরকারি হান্ডা গ্রুপকে ঢাকার অদূরে কেরানিগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের সময় চীনের ১২টি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, উৎপাদন ও শিক্ষা খাতে ৯২১ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।

মিরসরাইয়ে ভারতের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই বাতিল করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটিতে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় এবং ঋণ সহায়তার তালিকায় স্থান না পাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার গত বছর জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাতিল করে। বাতিল হওয়া ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাবিত প্রায় ৮৫০ একর জমিতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘ডিফেন্স ইকোনমিক জোন’ বা সামরিক অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য, সামরিক ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন করে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায়ও মিরসরাই অঞ্চলটি স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্য দিকে ২০১৫ সালে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের আওতায় বাগেরহাটে মোংলা বন্দরের কাছেই ১১০ একর জায়গা ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে ভারত সরকারের মনোনীত ডেভেলপার নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবরে এ প্রকল্প বাতিল করে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে একই স্থানে ‘চায়না-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠায় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সাথে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মোংলা অঞ্চলের সাথে ঢাকা এবং অন্যান্য প্রধান শহরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, যা পণ্য পরিবহনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। মোংলায় নতুন চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মূলত উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প যেমন- ইলেকট্রনিক্স, টেলিযোগাযোগ সামগ্রী ও আধুনিক ওয়্যারহাউজ বা গুদাম নির্মাণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠায় ডেভেলপার ও ভূমি ইজারা চুক্তি সই হয়েছে। আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে সিইআইজেড গড়ে তোলা হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চলটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের আগে চার হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সিইআইজেড প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। পরিকল্পনা অনুয়ায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে এবং ২০৩১ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। পুরো প্রকল্পের মধ্যে দেশজ উৎস থেকে জোগান দেয়া হবে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের কাছে থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে চীন সফরকারী বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী পরিচালক আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। বাংলাদেশ এবারই প্রথম পাঁচ বছরের একটি ট্যাক্স আউটলুক (কর রূপরেখা) উপস্থাপন করেছে, যা সম্ভাব্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসকে তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরকালে চীনের ১২টি কোম্পানি ৯২১ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পে ৪৫০ কোটি ডলার, ঝংক্সিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশন শিল্প প্রকল্প স্থাপনের জন্য একক বৃহত্তম পরিবেশগত বিনিয়োগ হিসেবে ১৬৫ কোটি ডলার এবং চীন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) মোংলা পোর্ট ইকোনমিক জোন উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য ৬৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধা এবং লজিস্টিকস অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।