সপ্তাহের শুরুতেই পতনের শতক পার করল পুঁজিবাজার
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সত্যিকার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সৃষ্টি হওয়া ব্যাপক বিক্রয়চাপে দুই পুঁজিবাজারই পতনের শতক পার করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিন শুরু হওয়া এ যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেললেও পরবর্তী সময়ে তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠে। বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের ধারণা ছিল দ্রুতই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আর সাময়িক এই প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসবে বিশ্ব অর্থনীতি। কিন্তু দিন যতই এগোচ্ছে ততই ধারণা হচ্ছে যুদ্ধ আরো দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। আর এটিই চোখ খুলে দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতদিন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে অনেকটা হালকাভাবে নিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তাই যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম কিছুদিন পুঁজিবাজারে তার স্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও পরে তা কাটিয়ে ওঠে। এর অংশ হিসেবে দেশের পুঁজিবাজার সূচকের বড় ধরনের উন্নতিও ঘটে। লেনদেনেও একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখে বাজারগুলো। কিন্তু সম্প্রতি যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, যার প্রতিফলন ঘটছে বাজার আচরণে।
গতকাল লেনদেনের শুরুতে বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে দেশের দুই পুঁজিবাজার। মাঝখানে চাপ সামলে নেয়ার চেষ্টা থাকলেও তা খুব একটা কার্যকর হয়নি। লেনদেন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল ততই বাড়ছিল বিক্রয়চাপ। বেলা সাড়ে ১১টার পর এ চাপ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এতে বড় পতন দিয়েই লেনদেন শেষ করে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১০৭ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ২১৯ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ১১২ দশমিক ২৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ০২ ও ১৮ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল লেনদেনও হ্রাস পেয়েছে ডিএসইর। বাজারটির গতকাল ৫১২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ১১৪ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৬২৬ কোটি টাকা। তবে লেনদেন বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ৯ কোটি টাকা থেকে ৪৩ কোটিতে পৌঁছে লেনদেন।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ২২৮ দশমিক ৪০ পয়েন্ট পতনের শিকার হয়। ১৪ হাজার ৭০১ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট থেকে সূচকটি লেনদেন শুরু করলেও দিনশেষে তা নেমে আসে ১৪ হাজার ৪৭৩ দশমিক ০৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৫৩ দশমিক ৯৫ ও ১২৮ দশমিক ১৮ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা দিনের বাজার আচরণকে প্রত্যাশিত মনে করছেন। তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুর দিকে মনে হয়নি এটি এত দীর্ঘায়িত হতে পারে। কিন্তু এখন এ যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পুরো বিশ্বে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্য যেভাবে বাড়ছে তার একটি নেতিবাচক প্রভাব থেকে কোনো দেশই মুক্ত থাকতে পারবে না। তা ছাড়া আমাদের রেমিট্যান্স আয়ের একটি বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশই এ যুদ্ধে কমবেশি আক্রান্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আমাদের রেমিট্যান্স আয়ে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সবমিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে না পুঁজিবাজার। তবে তারা মনে করেন, এর মানে এই নয় যে, যুদ্ধের ফলে পুঁজিবাজার শেষ হয়ে যাবে। বিশ্বে বিভিন্ন সময় এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি যেমন হয় তেমনি আবার সে পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের উত্তরণ ও ঘটে। ফলে বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে বেশি আতঙ্কিত না হয়ে ভালো সময়ের অপেক্ষা করা।
এ দিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মনে। এর ফলেই লেনদেনের শুরু থেকে বিক্রয়চাপে অস্থির ছিল দুই বাজার। গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের বিভিন্ন ট্রেডিং ফ্লোরে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বললে তারা নয়া দিগন্তকে তাদের মনোভাবের কথা জানান। একজন বিনিয়োগকারী বলেন, শুরুতে বাজারে যুদ্ধের যে প্রভাব পড়েছিল তা ক্রমেই কাটিয়ে ওঠায় বিনিয়োগকারীরা সাহসী হয়ে ওঠেন। সবার ধারণা ছিল যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে এবং তা বাজারকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারবে না; কিন্তু সম্প্রতি সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে মনে হচ্ছে সামনের দিনগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য কঠিন হবে। এ ধারণা থেকেই বাজারে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এ চাপ আরো বাড়তে পারে বলে মনে করেন তারা। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া কোম্পানির ৯০ শতাংশের বেশি দরপতনের শিকার ছিল। কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানি ছাড়া সবগুলো খাতের বেশির ভাগ কোম্পানিরই দরপতন ঘটে। আবার বেশ কয়েকটি খাতে দর হারায় শতভাগ কোম্পানি। গতকাল বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৫টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ৩৫৪টি। অপরিবর্তিত ছিল ১১টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৯০টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৩৩টির দাম বাড়লেও কমেছে ১৪৮টির। দর অপরিবর্তিত ছিল ১৮টি সিকিউরিটিজের।