ব্রাজিলের শ্রেষ্ঠত্ব নাকি নতুন ইতিহাস জাপানের

Printed Edition
khela-1
জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনুশীলনে নেইমার, কুনহা ও ভিনিসিয়াসের হাসিই বলে দেয় ব্রাজিল কতটা নির্ভার : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের আসরে যুক্ত হওয়া ‘শেষ ৩২’ পর্বে অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ হতে যাচ্ছে ব্রাজিল ও জাপানের লড়াই। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল টুর্নামেন্টের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে মাঠে নামছে। আর বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিতে চাইবে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল জাপান। হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নকআউট ম্যাচে জয়ী দল জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১১টায় শেষ ষোলোতে উঠার লড়াইয়ে মাঠে নামবে দুই দল।

এই ম্যাচে বাড়তি আবেগও রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রীতিম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল জাপান। সেটিই ছিল ল্যাটিন আমেরিকার দেশটির বিপক্ষে প্রথম জয় এশিয়ার ফুটবল পরাশক্তিদের। ফলে কার্লো অ্যানচেলোত্তির দল এবার সেই হারের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে বিশ্বকাপের নকআউটে পর্বের ম্যাচে। একই সাথে এটি কোচের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। কারণ ব্রাজিলের দায়িত্ব নেয়ার পর ধীরে ধীরে দলটিকে আবার শিরোপার লড়াইয়ে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।

গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল আত্মবিশ্বাসী। প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী মরক্কোর সাথে ড্র করলেও পরের দুই ম্যাচে স্কটল্যান্ড ও হাইতির বিপক্ষে দাপুটে জয় তুলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় সেলেকাওরা। সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল আক্রমণভাগের ধারাবাহিকতা। ব্রাজিলের আক্রমণভাগে গতি, সৃজনশীলতা এবং গোল করার ক্ষমতা প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে। এই দলে সবচেয়ে আলোচিত নাম অবশ্যই ভিনিসিয়াস জুনিয়র। টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে চার গোল করে তিনি দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। তার সাথে যোগ হয়েছে নেইমার জুনিয়রের অভিজ্ঞতা, তরুণ রায়ানের গতিময়তা, ম্যাথিউস কোনহার গোল করার ক্ষমতা এবং মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারাইসের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করেছে। আক্রমণে একাধিক বিকল্প থাকায় ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে গতি বাড়ানোর সামর্থ্য রয়েছে সেলেকাওদের। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ভিনিসিয়াস এখন ব্রাজিলের মাত্র পাঁচজন খেলোয়াড়ের একজন, যারা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছেন; এর আগের গ্রুপ পর্বে চারজন গোলকরা ফুটবলারই শিরোপা জিতেছিল। যার মধ্যে জাইরজিনহো ১৯৭০, রোমারিও ১৯৯৪, রোনালদো নাজারিও এবং রিভালদো ২০০২।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রক্ষণে। অতীতের মতো কেবল আক্রমণনির্ভর না থেকে অ্যানচেলোত্তি দলকে আরো সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছেন। ফুল-ব্যাকদের নিয়ন্ত্রিতভাবে ওপরে ওঠা, মিডফিল্ডে বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোর পরিকল্পনা এখন ব্রাজিলের খেলায় স্পষ্ট। নকআউট পর্বে এই ভারসাম্যই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।

অন্য দিকে কেন এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি জাপান, আবারো তা দেখিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের পর গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে শেষ ৩২-এ উঠেছে তারা। সুসংগঠিত ফুটবল, দ্রুত পাসিং এবং উচ্চগতির ট্রানজিশন সবচেয়ে বড় অস্ত্র সূর্যোদ্বয়ের দেশটির। বড় দলের বিপক্ষে ভয় না পেয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মানসিকতাই আলাদা করে তোলে ব্লু সামুরাইদের। তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবলে জাপান এখন পর্যন্ত কোনো নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি; ২০০২, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা টানা শেষ ষোলোতে হেরেছে।

কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর দল দলে চোট সমস্যায় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় অনুপস্থিত থাকলেও জাপানের মূল শক্তি দলগত সমন্বয়। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে তারা সমষ্টিগত ফুটবলের ওপর বেশি নির্ভর করে। মাঝমাঠে দ্রুত বলের দখল এবং দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলাই হবে তাদের মূল পরিকল্পনা। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচের ৩৯ মিনিটে চোটে পড়ে মাঠ ছাড়েন সেন্টার-ব্যাক কো ইতাগুরা। যদিও চোটটি গুরুতর নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড় তাকেফুসা কুবোকে নিয়ে আরো উদ্বেগ রয়েছে, হাঁটুর চোটে এখনো পুরোপুরি অনুশীলন করতে পারছেন না। তাই শেষ ৩২-এ তার খেলার সম্ভাবনা খুবই কম। গত ম্যাচে উদ্বোধনী গোল করার পর নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেন দাইজেন মায়েদা। সানো ইউকিনারি সুগাওয়ারার পরিবর্তে দলে ফিরতে পারেন মাঝমাঠের সেনাপতি কাইশু।

দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ব্রাজিল। এখন পর্যন্ত মোট ১৪বার আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি লড়াইয়ে ১১টি ম্যাচ জিতেছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি। ড্র দু’টি ম্যাচে আর একটি মাত্র জয় পেয়েছে জাপান। দুই দলের সবশেষ দেখায় ২০২৫ সালের কিরিন চ্যালেঞ্জ কাপে ব্রাজিলকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী জাপান। অভিজ্ঞতার বিচারেও অবশ্য অনেক এগিয়ে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তারা সবচেয়ে সফল দল, আর নকআউট পর্বে চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতাও অনেক বেশি। জাপান এর আগে একাধিকবার শেষ ষোলোয় উঠলেও কখনো কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারেনি। ফলে এবার তাদের সামনেও রয়েছে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ।