বেকার যুবকদের বিকল্প পেশা : ফ্রিল্যান্সিংয়ে সম্ভাবনার সাথে রয়েছে চ্যালেঞ্জও
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
যথাযথ নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে ফ্রিল্যান্সিং শুধু ব্যক্তিগত আয়ের মাধ্যম নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি এতে রয়েছে বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২০(১) অনুচ্ছেদে কর্মকে নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় শিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ এখনো বেকারত্বের চাপে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে ফ্রিল্যান্সিং এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে। দেশে প্রায় ৮ লক্ষাধিক সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। তবে সংখ্যার এই বৃদ্ধির সাথে সাথে একটি বড় সমস্যা সামনে এসেছে- দক্ষতার ঘাটতি বা ‘স্কিল গ্যাপ’। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সাধারণ ডেটা এন্ট্রি বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো ক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে চলে যাচ্ছে। ফলে কম দক্ষ ফ্রিল্যান্সাররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
অন্য দিকে, এআই-ভিত্তিক দক্ষতা যেমন প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমেশন বা ডেটা অ্যানালিটিক্সে পারদর্শীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ আনোয়ার শাহী বুলবুলের মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি নতুন নয়; ইতিহাসে প্রতিবারই নতুন প্রযুক্তি পুরনো কাজের ধরন বদলে দিয়েছে।
তার ভাষায়, ‘এআই সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো সহজ করে দিলেও ক্লায়েন্টের আবেগ, কৌশলগত চিন্তা বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই যারা প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, এখনকার যুগে শুধু ‘কাজ সম্পাদনকারী’ নয়, বরং ‘চিন্তাশীল দক্ষ কর্মী’ হওয়াটাই টিকে থাকার মূল শর্ত।
চাকরি বনাম ফ্রিল্যান্সিং : কোনটি বাস্তবসম্মত?
বাংলাদেশে একটি সাধারণ চাকরিতে মাসিক আয় যেখানে ২৫-৪০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে একই দক্ষতা দিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক ক্লায়েন্ট থেকে বেশি আয় সম্ভব। একটি আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সার সময়ের স্বাধীনতা ও কাজের নিয়ন্ত্রণের কারণে তুলনামূলক বেশি সন্তুষ্ট। তবে এটি সবার জন্য উপযোগী নয়। উদ্যোক্তা নাফিস মাহাদীর মতে, ‘যারা নির্দিষ্ট নির্দেশনা ছাড়া কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তাদের জন্য চাকরি ভালো। আর যারা অনিশ্চয়তা সামলাতে পারেন, তাদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং বড় সুযোগ।’
যদিও ফ্রিল্যান্সিং সম্ভাবনাময়, বাস্তবতা হচ্ছে- প্রায় ৭০-৭৫% নতুন ফ্রিল্যান্সার প্রথম দুই বছরের মধ্যেই ঝরে পড়েন। এর প্রধান কারণগুলো হলো : সঠিক দক্ষতার অভাব; ধৈর্যের ঘাটতি; দ্রুত সফল হওয়ার অবাস্তব প্রত্যাশা এবং যথাযথ মেন্টরশিপের অভাব। গ্রাফিক্স ডিজাইনার রিফাত আহমেদের মতে, ‘দীর্ঘমেয়াদে মাত্র ২০% ফ্রিল্যান্সার টিকে থাকতে পারেন। যারা দক্ষতা ও মার্কেটপ্লেসে অবস্থান তৈরি করতে পারেন, তারাই সফল হন।’
উত্তরণের পথ : কী করতে হবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব থেকে উত্তরণের জন্য ফ্রিল্যান্সিংকে কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয় জরুরি- ১. স্পেশালাইজেশন: সব কিছু জানার চেষ্টা না করে নির্দিষ্ট একটি দক্ষতায় পারদর্শী হওয়া। ২. এআই-কে গ্রহণ করা: প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে কাজের গতি ও মান বাড়াতে ব্যবহার করা। ৩. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: ফ্রিল্যান্সিংকে শুধু আয়ের উৎস নয়, ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা হওয়ার ভিত্তি হিসেবে দেখা। ৪. মেন্টরশিপ ও প্রশিক্ষণ: সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা। ৫. মানসিক দৃঢ়তা: শুরুতে ব্যর্থতা আসবে- এটি মেনে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাওয়া।
ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশের বেকার যুবকদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী বিকল্প। তবে এটি কোনো শর্টকাট নয়; বরং কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও ধৈর্যের সমন্বয়।