সুজনের গোলটেবিল আলোচনায় শ্রম উপদেষ্টা
সংস্কারের মূল প্রতিবন্ধকতা রাজনৈতিক দলের মনোভাব
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে : মনির হায়দার
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সংস্কারের বিষয়ে সমস্যাগুলো তুলে ধরে শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, মূল প্রতিবন্ধকতা হলো রাজনৈতিক দলের মনোভাব। এখনো কোনো প্রধান রাজনৈতিক দল স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেনি যে তারা আগের মতোই চলবে নাকি পরিবর্তন আনবে। যদিও একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যারা সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল, বারবার সংস্কারের পক্ষে মন্তব্য করেছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে সেই ধরনের অঙ্গীকার এখনো শোনা যায়নি।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ শামসুল হক মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘গণভোট : ২০২৬, কী এবং কেন?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমরা কি কখনো কোনো মন্ত্রীকে গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে সরাসরি গ্রামবাসীর সাথে বসে আলোচনা করতে দেখব, তাদের কি মেট্রোরেলের প্রয়োজন, নাকি গ্রামের কাঁচা রাস্তা পাকা করার প্রয়োজন? এসব কাজ করতে হলে বর্তমান সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। সিস্টেমকে যেভাবে বদলানোর কথা বলা হয়েছে, সেভাবে তা বাস্তবায়ন হবে না। তাই গণভোটে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত জরুরি। এখন মূল প্রশ্ন হলো, আমরা কী চাই এবং সাধারণ মানুষ কী চায়? আমরা কি আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাই, নাকি একক গণতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছি? আমরা কি সব ক্ষমতা একক হাতে দিচ্ছি? মন্ত্রীরা কি বলবেন যে তারা শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হুকুমে কাজ করছেন?
এ ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণভোট কিভাবে হবে, সেটিও জনগণকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কারণ গণভোট আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বও নির্বাচন কমিশনের ওপরই থাকবে।
ইসিকে অনুরোধ জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কমিশনকে জনগণকে সচেতন করার কাজে সক্রিয় হতে হবে। শুধু ভোট কেমন হবে তা জানানো নয়, জনগণকে বোঝাতে হবে গণভোট কিভাবে হবে। প্রয়োজনে অন্যদের সহযোগিতাও নিতে হবে। তিনি সতর্ক করেন, যদি এটি শুধু সরকার পরিচালনা করে, তখন বিভিন্ন গুঞ্জন ও ক্যাম্পেইন সৃষ্টি হবে, যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে : প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেছেন, যদি এবারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী না হয়, না জয়যুক্ত হয় (হবে না, কিন্তু আমি বলছি যদি না হয়) তাহলে একদম নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবেই, কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারণ এই গণভোটের আয়োজনই করা হয়েছে ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর জন্য, আর কিছু না।
মনির হায়দার বলেন, ভোটে দুটো ঘটনা ঘটে। হয় বিজয়ী হয় না-হলে পরাজিত হয়। ক্যান্ডিডেট থাকুক বা না থাকুক এবার এ ক্ষেত্রেও তাই হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে গণভোট যে সাবজেক্ট নিয়ে এসেছে সেই সাবজেক্টটা অনুমোদিত হলো জনগণ দ্বারা, আর ‘হ্যাঁ’ না জিতলে অনুমোদিত হলো না। হ্যাঁ না জিতলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে।
সবার মতামতের ভিত্তিতেই জুলাই সনদ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ হঠাৎ কারো মাথা থেকে এসেছে আর তিনি একটা অনুষ্ঠানে এসে বললেন সবাই এটা স্বাক্ষর করেন, আর রাজনৈতিক দলগুলো সুরসুর করে সেখানে হাজির হয়ে স্বাক্ষর করে দিলো, ব্যাপারটা তো এরকম ছিল না। এইটা তৈরি করা হয়েছে একটা জাতীয় প্রপার্টি হিসেবে, জাতীয় সম্পদ হিসেবে। জাতির পক্ষে সরকার এবং সব রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি সবাই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বসে আলোচনা করে, গবেষণা করে, সলাপরামর্শ করে এই জিনিসটা তৈরি করেছে।
এটাকে ফ্যাসিবাদ তাড়ানোর ব্যবস্থাপত্র আখ্যা দিয়ে মনির বলেন, এটা করাই হয়েছে আমাদের গত ১৬ বছরের প্রধানত জায়গায় পরিবর্তন ঘটানোর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকাতে। সহজ ভাষায় বললে ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর প্রেসক্রিপশন হলো এইটা। এই ব্যবস্থাপত্র যদি আমরা অনুমোদন করে আমাদের জাতীয় জীবনে বাস্তবায়ন ঘটাতে না পারি, তাহলে নিশ্চিতভাবে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে এবং আমরাই সেটা নিয়ে আসব, এটার জন্য অন্য কেউ দায়ী থাকবে না, জাতি হিসেবে আমরাই নিয়ে আসব।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সাধারণ ভোটারদের কাছে এটার অনেক কিছুই অস্পষ্ট। পাশাপাশি এই জুলাই জাতীয় সনদ, এই সংস্কার উদ্যোগ, এই গণভোটকে ঘিরে নেগেটিভ ক্যাম্পেইন, অপপ্রচার এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার নানা তৎপরতা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান। কেন এটা বিদ্যমান? যেই ফ্যাসিবাদীদেরকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষ বিতাড়িত করেছে তারা বিতাড়িত হয়েছে রাজনৈতিকভাবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে তারা বিতাড়িত হয়েছে, কিন্তু তাদের ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
প্রার্থীরা নিজেদের প্রচার করছেন, গণভোটের প্রচার করছেন না : কাজী হায়াত
একইসাথে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন হলেও প্রার্থীরা শুধু নিজেদের প্রচার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াত।
তিনি বলেন, কথা ছিল যারা নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট (প্রার্থী) হবেন তারা দু’টি দায়িত্ব পালন করবেন। ‘হ্যাঁ’, ‘না’ ভোটের পক্ষে নাকি বিপক্ষে সেটি প্রচার করবেন এবং তাদের নিজেদের ভোট চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে এটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাস্তবে হচ্ছে তার ভোটটা শুধু সে নিজে চাচ্ছে। এদিকে হ্যাঁ, না ভোটের কী হলো- না হলো সেটা সে এখতিয়ার করছে না। এই বিষয়ে কী করা যায় সেটা সরকারের ভাবা উচিত। তিনি আরো বলেন, আমার শ্রদ্ধেয় সকিনার (গ্রামের একজন মহিলা) কাছে আমার গণভোটের খবরটা কিভাবে পৌঁছে দিতে পারি। তাকে বলতে পারি যে, তোমার সুযোগ এসেছে অস্তিত্ব জাহির করার, হ্যাঁ বা না ভোট দেয়ার। তোমার ক্ষমতা প্রকাশ করার সময় এসেছে। তুমি এই সুযোগটা এবার হেলায় হারিও না। এই জন্য আমি অনুরোধ করব সুজন এবং সরকারের কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। তারা এ ব্যাপারে অঙ্গীকার প্রদান করেছেন এবং স্বাক্ষর প্রদান করেছেন। তাদের এখান থেকে বেছে বেছে বাস্তবায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। দলগুলোকে অবশ্যই তারা ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোটের পক্ষে সেটা পরিষ্কার করতে হবে।
আমরা চাই স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। জুলাই জাতীয় সনদ জনগণের রাজপথের আন্দোলন, বিপুল আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনাপ্রসূত হতাশার বিপরীতে রাজপথের ঐক্যের প্রতীক হয়ে জন্ম নেয়া একটি সামাজিক চুক্তি। এর প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার ছাড়া গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্ভব নয়।