গাকৃবি উদ্ভাবিত ‘জিএইউ সয়াবিন-৬’ খুলছে কৃষির নতুন দিগন্ত

খরার চ্যালেঞ্জে যুগান্তকারী সাফল্য

Printed Edition

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

বাংলাদেশের খরাপ্রবণ জমি ও উপকূলীয় চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের কৃষিসঙ্কটে আশার আলো জ্বালালো গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)। দেশে প্রথমবারের মতো উচ্চ খরাসহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন-৬’ উদ্ভাবন করে প্রতিষ্ঠানটি কৃষি গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। দীর্ঘ গবেষণা, মাঠপর্যায়ের কঠোর পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে উদ্ভাবিত এ জাত ইতোমধ্যেই দেশের কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে প্রায় এক দশকের নিরলস গবেষণার ফল হিসেবে এ জাতের উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে গাকৃবির উদ্ভাবিত মোট ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪-এ, যা বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজমের ওপর তিন বছরের কঠোর গবেষণায় ‘জি০০০৫৬’ জার্মপ্লাজমটি খরাসহনশীল হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’র সহায়তায় নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলায় পাঁচ বছরের মাঠপর্যায়ের সফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে জাতীয় বীজ বোর্ড গত ১১ নভেম্বর জাতটির আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করে।

৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও টিকে থেকে উচ্চ ফলন দেয়ার বিরল সক্ষমতা রয়েছে ‘জিএইউ সয়াবিন-৬’-এর। উপকূলীয় চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা থাকায় এটিকে কৃষিবিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাকৃবির গবেষক দল জানান, প্রতি গাছে ৮০-১০০টি ফল ধারণক্ষমতা এবং বড় দানার বৈশিষ্ট্যের কারণে ১০০০ বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। সাধারণ জাতের তুলনায় অধিক ফলনশীল এ জাত থেকে হেক্টরপ্রতি ৩.২ থেকে ৩.৮ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকরা স্বল্প সময়ে অধিক লাভবান হতে পারেন।

জাতটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা তুলনামূলক কম। ফলে পোলট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে, যা পোলট্রি শিল্পের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও সয়াবিন অত্যন্ত সমৃদ্ধ; এতে রয়েছে প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন ও ১৮-২০ শতাংশ তেল। পাশাপাশি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান সমৃদ্ধ এ ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

ড. মান্নান বলেন, জিএইউ সয়াবিন-৬ আমাদের দীর্ঘ গবেষণা, মাঠের রোদবৃষ্টি আর কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ জাত বেশ ফলপ্রসূ হবে। খরাপ্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ এত দিন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল; এ জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

এ সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে গাকৃবির ভিসি প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন-৬ বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী অর্জন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনয়নে এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।’ তিনি গবেষক দল, ল্যাব ও মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। উল্লেখ্য, এর আগে একই গবেষণা দল লবণ ও জলাবদ্ধতাসহনশীল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আরো পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাত উদ্ভাবনে সাফল্য অর্জন করেছে।