স্কুল ও হাসপাতালে পানি-স্যানিটেশনে অগ্রগতি সত্ত্বেও রয়েছে গভীর বৈষম্য
বিবিএস-ইউনিসেফের প্রতিবেদন
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) ব্যবস্থার বিস্তার গত এক দশকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ডঅঝঐ রহ ঊফঁপধঃরড়হ ধহফ ঐবধষঃযপধৎব ঋধপরষরঃরবং ঝঁৎাবু ২০২৪’ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে- এ অগ্রগতির আড়ালে রয়েছে গুণগত ঘাটতি, প্রবেশগম্যতার বৈষম্য এবং জলবায়ু ঝুঁঁকিতে নাজুক অবকাঠামো।
জুন-জুলাই ২০২৪ সময়ে দেশের আট বিভাগ ও ৬৪ জেলায় সরকারি-বেসরকারি স্কুল এবং বিভিন্ন স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালানো হয়। ওয়াটসনের সূত্র অনুযায়ী নমুনা নির্বাচন হওয়ায় তথ্যগুলো জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল।
পানির প্রাপ্যতা আছে, কিন্তু ব্যবহারযোগ্যতা সীমিত : জরিপ অনুযায়ী, স্কুলের ৯৫.৪ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ৮৭.৫ শতাংশে উন্নত পানির উৎস রয়েছে। তবে ‘বেসিক ওয়াটার সার্ভিস’- অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ- এ মান পূরণ করে মাত্র ৮৬.১ শতাংশ স্কুল ও ৭০.৫ শতাংশ হাসপাতাল।
আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রতিবন্ধী ও চলাচলে সীমাবদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য পানির উৎসের প্রবেশগম্যতা স্কুলে মাত্র ৫৫.৪ শতাংশ, আর হাসপাতালে ৪০.৯ শতাংশ। গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা শিক্ষা কার্যক্রম ও রোগীসেবাকে নিয়মিত ব্যাহত করছে। রক্ষণাবেণে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ আছে এমন স্কুল মাত্র ১১.১ শতাংশ, যা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা নির্দেশ করে।
স্যানিটেশন : সংখ্যায় আছে, মানে নেই : স্কুলের ৯০.৬ শতাংশ ও হাসপাতালের ৯৮.৫ শতাংশে অন্তত একটি টয়লেট থাকলেও মান ও ব্যবহারযোগ্যতায় বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রতি ৫০ শিক্ষার্থীর জন্য একটি উন্নত টয়লেটের আন্তর্জাতিক মান পূরণ করে মাত্র ২৮.৬ শতাংশ স্কুল। পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। ফিক্যাল স্লাজ নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পেরেছে স্কুলের মাত্র ৩৩.৯ শতাংশ এবং হাসপাতালের ৪৫.৪ শতাংশ। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁঁকি বাড়ছে। প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটের চিত্র আরও হতাশাজনক-স্কুলে মাত্র ৪.৬ শতাংশ এবং হাসপাতালে ৩০.৬ শতাংশ।
হাত ধোয়া ও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চরম সংকট : হাত ধোয়ার ব্যবস্থা অনেক প্রতিষ্ঠানে থাকলেও পানি ও সাবান একসঙ্গে পাওয়া যায় না। ফলে ‘বেসিক হ্যান্ডওয়াশিং সার্ভিস’ নিশ্চিত হয়েছে স্কুলের মাত্র ৫১.৭ শতাংশে, আর হাসপাতালে ভয়াবহভাবে কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সরাসরি ঝুঁঁকির মুখে ফেলছে।
মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা (এমএইচএম) ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মাত্র ২০.৭ শতাংশ স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত স্থান রয়েছে এবং ৬.৯ শতাংশ স্কুলে মৌলিক এমএইচএ সুবিধা বিদ্যমান। এর ফলে কিশোরীদের অনুপস্থিতি, মানসিক অস্বস্তি এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁঁকি বাড়ছে যা সরাসরি লিঙ্গসমতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর প্রভাব ফেলে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : স্বাস্থ্যখাতে বড় ঝুঁকি : স্কুলের ৭৮.৩ শতাংশে কঠিন বর্জ্য তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে অপসারণ হলেও হাসপাতালের মাত্র ২৫.৪ শতাংশে নিরাপদ চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। প্রায় ৪১.৬ শতাংশ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো হয়, যা বায়ুদূষণ, বিষাক্ত নির্গমন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি।
জলবায়ু ঝুঁকি ও অবকাঠামোর ভঙ্গুরতা : গত ১২ মাসে স্কুলের ২৪ শতাংশ ও হাসপাতালের ১৯.৪ শতাংশ কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েছে, যার ফলে পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ জলবায়ু সহনশীল ওয়াশ ব্যবস্থার বিষয়ে সচেতনতা স্কুলে মাত্র ৩৩.৭ শতাংশ এবং হাসপাতালে ৯.৯ শতাংশ। বাস্তবায়নের হার আরো কম। এটি ভবিষ্যৎ দুর্যোগে সেবা অব্যাহত রাখার সমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কেন এ বৈষম্য : বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা কেবল অবকাঠামো ঘাটতির নয়; এটি পরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ, স্থানীয় রক্ষণাবেণ সমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশার অভাবের সমষ্টিগত ফল। প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন হলেও নিয়মিত অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সের জন্য অর্থায়ন নেই। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ও নারীবান্ধব নকশা এখনো পরিকল্পনার কেন্দ্রে আসেনি। স্বাস্থ্যখাতে হাত ধোয়া ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সমতাকে ঝুঁঁকিতে ফেলছে, যা ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবেলায় বড় বাধা হতে পারে।
কোথায় বিনিয়োগ জরুরি : জরিপটি কয়েকটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল নিশ্চিতকরণ; প্রতিবন্ধী ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করা; হাসপাতালে ওয়াশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক বিনিয়োগ; জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ওয়াশ অবকাঠামো সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও গুণগত মান, টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ু সহনশীলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ ঘাটতিগুলো দূর না হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে কাক্সিক্ষত মানব উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হবে।
এ জরিপ নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি শক্তিশালী রোডম্যাপ তৈরি করেছে-যার সঠিক বাস্তবায়নই পারে স্কুল ও হাসপাতালকে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং সমতার ভিত্তিতে সবার জন্য উপযোগী করে তুলতে।