স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি : প্রকোপ কমেছে

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৫ শিশুর মৃত্যু

Printed Edition
back-1
মহাখালী ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্ত শিশুরা : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিন শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বাকি দুই শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ হিসাব ১৬ এপ্রিল সকাল আটটা থেকে ১৭ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ১১৫ শিশু। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১২৭ শিশুর।

এ দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

২৪ ঘণ্টায় হামে যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে দুই শিশু বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলার। আর একটি ঢাকা বিভাগের। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া দুই শিশুই ঢাকা বিভাগের। এ সময়ে সর্বোচ্চ ১২০ শিশুর হাম শনাক্ত হয় ঢাকা বিভাগে। পাঁচ শিশুর হাম শনাক্ত হয় রাজশাহী বিভাগে। বরিশাল ও খুলনায় একটি করে শিশুর হাম শনাক্ত হয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে এক হাজার ১১৫ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা যায়। এর মধ্যে ৫১৫ জনই ঢাকা বিভাগের। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৬৯ শিশু। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৫৭ শিশু ভর্তি হয়। সবচেয়ে কম চার শিশু ভর্তি হয় রংপুর বিভাগে। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৭৪৭ শিশু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে।

সিলেটে ১০ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু

সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে হাম আক্রান্ত হয়ে ১০ দিনে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ এপ্রিল হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চার মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে ৮ এপ্রিল রাতে আরিশা নামে পাঁচ মাস বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয় একই হাসপাতালে। আর ১০ এপ্রিল বিকেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দিব্য নামে সাত মাস বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। সবশেষ গত বুধবার সকালে ১০ মাস বয়সী শিশু আব্দুল্লাহ ও বিকাল চারটার দিকে ১০ মাস বয়সী হুজাইফার মৃত্যু হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

ওসমানী হাসপাতালের আইসিইউর ১০টি বেডই পূর্ণ হয়ে গেছে হাম আক্রান্ত শিশু রোগীতে।

অবস্থা খারাপ হলে কোভিডের মতো প্রস্তুতি নেয়ার কথা ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির আশঙ্কায় নিয়োগ দেয়া হচ্ছে আলাদা মেডিক্যাল অফিসার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যত দিন যাচ্ছে, সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ও ভর্তি রোগীসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে জ্বর, সর্দি-কাশিতে সিলেটে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। ডাক্তার দেখাতে হাসপাতালে গেলে অবস্থা গুরুতর দেখে হাসপাতালে ভর্তি দিচ্ছেন ডাক্তাররা। আর অবস্থা মোটামুটি ভালো হলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, চিকিৎসাসেবা দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন তাদের।

বর্তমানে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছেন ১২৩ জন। আর ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বরগুনায় ২০৭ জনের শরীরে উপসর্গ

বরগুনা প্রতিনিধি জানান, বরগুনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, বরগুনায় ইতোমধ্যে ২০৭ জনের শরীরে হাম রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৩৭ জনের। সন্দেহের তালিকায় থাকা তিন শিশুর মৃত্যুর খবর জনমনে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। জ্বর, সর্দি আর তীব্র কাশির সাথে শরীরে লালচে র‌্যাশ নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

বামনা হাসপাতালের ডা: সারা জানান,গত বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত ছিলো উপকূলীয় এই বরগুনা জেলা। তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার জেঁকে বসেছে হামের প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য অধিদফতর বরগুনাকে হামের হটস্পট ঘোষণা করলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। গত বছর ডেঙ্গু রোগে কেড়ে নিয়েছিল ১৫ জনের প্রাণ; কিন্তু এ বছর আলোচনার কেন্দ্রে হলো হাম।

বরগুনা সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, বরগুনায় নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি। নমুনা সংগ্রহ করে পাঠাতে হয় ঢাকায়, যার রিপোর্ট আসতে পার হয়ে যায় অনেক সময়। তবে সংক্রমণ কিছুটা কমছে। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও হাম সংক্রমণ রোধে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।

দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

বাসস জানায়, দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম শুরু করলে এটা আরো কমে যাবে। আশা করি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

শুক্রবার বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

টিকার কোনো ঘাটতি নেই জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো টিকার ঘাটতি নেই। সব ধরনের টিকার পর্যাপ্ত মজুত আছে। গ্রাম এলাকায় ও আমাদের হাতে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন মজুত আছে তা দিয়ে আগামী জুন মাস পর্যন্ত বিনা বাধায় আমরা ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবো। তবে আগামী মাসে একটা জায়গায় আমাদের কিছু ঘাটতি দেখা দিতে পারে সেটা হলো .০৫ সিরিঞ্জ। সে ঘাটতি পূরণ করতে আমরা ইতোমধ্যে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে এটি পাইপলাইনে আছে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে আমরা সিরিঞ্জের এ ঘাটতিও পূরণ করতে পারবো। ইউনিসেফের মাধ্যমে আমরা আংশিক সিরিঞ্জ আগামী সাত দিনের মধ্যে নিয়ে নেবো। আর বাকিগুলো মে মাসের মধ্যে তারা আমাদের সরবরাহ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেভাবে হামের রোগী নিয়ে ঢাকায় আসে এজন্য ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর কিছুটা চাপ পড়ে। সে সমস্যা সমাধানে আমরা রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল হামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের কিছু জনবলের ঘাটতি আছে, সেগুলোই ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছি। খুব শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে। দেশে চলমান টিকা কার্যক্রম নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যে ইউনিসেফ, গ্যাভি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সহায়তায় দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু করেছি এবং আগামী ২০ এপ্রিল বৃহৎ পরিসরে শুরু হবে।

এ সময় স্বাস্থ্যসচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও ইপিআইর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।