১৭ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন ড্রেনের পানিতে নদীদূষণ

Printed Edition
bangla-1
জনবসতিহীন এলাকায় ড্রেন নির্মাণ : নয়া দিগন্ত

চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রতিনিধি

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রায় ১৭ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হতে না হতেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার- মাথাভাঙ্গা ও এর শাখা নবগঙ্গা নদীতে সরাসরি বর্জ্য পানি ফেলায় মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ইতোমধ্যে মাথাভাঙ্গা নদীতে ড্রেনের মাধ্যমে ময়লা পানি প্রবাহিত হওয়ায় নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। একইভাবে নবগঙ্গা নদীতেও ড্রেন সংযোগের মাধ্যমে বর্জ্যপানি ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা নদীটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সচেতন মহল এ বিষয়টিকে ‘নদীকে মেরে ফেলার চক্রান্ত’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ঘোড়ামারা ব্রিজ এলাকা থেকে নবগঙ্গা নদীর সাথে সংযুক্ত ড্রেন নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে প্রায় ৭০০ মিটার সম্পন্ন হয়েছে। আরো প্রায় ৩৫০ মিটার কাজ বাকি রয়েছে। ঘোড়ামারা ব্রিজ থেকে ছাগল খামার সংলগ্ন পানি শোধনাগার হয়ে সাইকেল হাট পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণ করা হলেও আশপাশে উল্লেখযোগ্য কোনো বসতি নেই। ফলে জনবসতিহীন এলাকায় এ ধরনের ড্রেন নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে স্থানীয়রা।

পৌরসভার পক্ষ থেকে ‘স্থিতিস্থাপক নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের (আরইউটিডিপি)’ আওতায় প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ এবং ১০০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপনের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৮ হাজার ৫১৯ টাকা, যা চুক্তির মাধ্যমে কমিয়ে ১৭ কোটি ২ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি হলো খাগড়াছড়ির ‘এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা লিমিটেড’। স্থানীয়ভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদার রাফিতুল্লাহ মহলদার ও তার সহযোগী আবু জাফর মন্টু।

প্রকল্পের আওতায় শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকায় উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে শ্মশান মোড় থেকে শিয়ালমারী ব্রিজ, হাজরাহাটি এলাকা, বড়বাজার চৌরাস্তা থেকে শেকড়াতলা ও মুচিপাড়া, পৌর কলেজ সংলগ্ন সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ ও স্ট্রিট লাইট স্থাপন।

তবে বাস্তবায়নাধীন কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘোড়ামারা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ৭৫০ মিটার নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৫০ মিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ড্রেনের প্রস্থ ও গভীরতা নিয়েও ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের মান যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো তদারকি কর্মকর্তা বা পৌরসভার প্রতিনিধিকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে না।

সিনেমা হলপাড়া এলাকার বাসিন্দা জোনারুল ইসলাম ও গুলশানপাড়ার গোলাম ফারুক বলেন, যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ঘনবসতি রয়েছে, সেখানে এখনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ যেখানে আগামী কয়েক দশকেও বসতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান বলেন, এটি পৌরসভার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প, যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রকল্পটির কাজ উদ্বোধন করা হয় এবং ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কাজের গতি বাড়াতে ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে লিখিতভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

অন্য দিকে ঠিকাদার রাফিতুল্লাহ মহলদার ও আবু জাফর মন্টু জানান, ঈদের ছুটির কারণে শ্রমিক সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। ফলে কাজের গতি কিছুটা কমে যায়। বর্তমানে আবার কাজ শুরু হয়েছে এবং প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করছে। ভুট্টা শুকানোর মৌসুমের এ সময়ে কিছুটা শ্রমিক সঙ্কট থাকলেও দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে বলে তারা জানান।

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রশাসক শারমিন আক্তার বলেন, পৌরসভার উন্নয়ন কাজ শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। এটি জনগণের সম্পদ। কোথাও কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি দেখা গেলে নাগরিকদের তা জানাতে হবে।

এদিকে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে প্রকল্পের নকশা পুনর্বিবেচনা, নদীতে বর্জ্য পানি নিষ্কাশন বন্ধ এবং কাজের অনিয়মের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, উন্নয়নের নামে নদী ধ্বংস করা হলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভয়াবহ হবে।