কাশ্মিরে গুপ্তচরবৃত্তি, ধ্বংসযজ্ঞ : ইসরাইলি মডেল অনুসরণ করছে ভারত

Printed Edition

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

২০১৯ সালের নভেম্বরে নিউ ইয়র্কে ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ভারতের উচিত কাশ্মিরে ইসরাইলি মডেল অনুসরণ করা। সে সময় ভারত-শাসিত কাশ্মিরে কঠোর সামরিক বিধিনিষেধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা চলছিল। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে হাজার হাজার মানুষকে বন্দী করেছিল, যার মধ্যে ভারতপন্থী রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন।

ভারতীয় ওই কূটনীতিক মূলত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনের আদলে কাশ্মিরেও হিন্দু পণ্ডিতদের পুনর্বাসনের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে এটা সম্ভব হলে আমরাও কেন পারব না? ছয় বছর পর সন্দীপ চক্রবর্তীর সে কথাগুলোই যেন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া মোদির দ্বিতীয় ইসরাইল সফরের আগে বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশ এখন কেবল বাণিজ্য বা সামরিক অংশীদারিত্বে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তাদের শাসনব্যবস্থাও এখন একে-অপরের ছায়ায় পরিণত হয়েছে।

দমনপীড়নের নতুন রূপ

বিশ্লেষকদের মতে, এ গভীর সম্পর্কের মূলে রয়েছে দুই দেশের অভিন্ন আদর্শ। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী দর্শন ভারতকে একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়তে চায়, ঠিক যেভাবে ইসরাইল নিজেকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দেয়। ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ডস’ বইয়ের লেখক আজাদ এসা বলেন, মোদি ও ইসরাইলের বন্ধন মূলত দু’টি উগ্রবাদী আদর্শের মিলন, যেখানে মুসলিমদের জনতাত্ত্বিক ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা হয়।

এ ‘ইসরাইলি মডেলে’র অন্যতম উদাহরণ হলো ভারতের ‘বুলডোজার বিচার’। গত এক দশকে ভারতের বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে আইনি নোটিশ ছাড়াই শত শত মুসলিমের ঘরবাড়ি, দোকান ও মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে তার সমর্থকরা এখন ‘বুলডোজার বাবা’ বলে ডাকেন। এটি হুবহু ইসরাইলের সে নীতির মতো, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে ইহুদি বসতি গড়া হয়।

নিরাপত্তা ও নজরদারি

ভারত ও ইসরাইলের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো প্রতিরক্ষা। ভারত ইসরাইলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। অন্য দিকে, গাজায় চলমান যুদ্ধের সময় ভারতও ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। কেবল অস্ত্র নয়, ইসরাইলি নজরদারি প্রযুক্তি ‘পেগাসাস’ ব্যবহার করে ভারতের সাংবাদিক ও বিরোধীদের ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগও উঠেছে। দ্য ওয়্যার-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদারাজন বলেন, বিরোধীদের দমনে ইসরাইলি প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোদি সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কেড়ে নিচ্ছে।

কাশ্মির ও ফিলিস্তিন : এক অদৃশ্য মিল

বিশ্লেষকদের মতে, কাশ্মিরে ভারতের বর্তমান নীতি ইসরাইলের পশ্চিম তীর দখলের নীতির মতোই। ২০১৯ সালের পর থেকে কাশ্মিরকে একটি বিশাল কারাগারে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে সামরিক চেকপোস্ট, ব্যাপক নজরদারি এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার মতো ঘটনাগুলো ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের আচরণের কথা মনে করিয়ে দেয়। আজাদ এসা বলেন, ইসরাইল ভারতকে আরো বেশি কর্তৃত্ববাদী ও সামরিকায়ন করার প্রযুক্তি ও দক্ষতা দিচ্ছে। তারা জনগণকে এখন নাগরিক হিসেবে নয়, বরং বহিরাগত শত্রু হিসেবে গণ্য করছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি বিনা নোটিশে ঘরবাড়ি ভাঙার বিরুদ্ধে রায় দিলেও বাস্তবে এ বুলডোজার সংস্কৃতি থামেনি। সংবাদ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদি সরকারের অধীনে ভারত ক্রমশ ইসরাইলি ধাঁচের এক ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী’ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ভিন্নমত বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।