শাপলা চত্বরের নির্মম হত্যাযজ্ঞ

‘প্রধান কুশীলব’ সাবেক ডিআইজি জলিল কারাগারে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

এক যুগ আগে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ‘গণহত্যার’ অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডলকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল মঙ্গলবার অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মহিতুল হক এনাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন।

একই সাথে মামলার পরবর্তী শুনানি ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৫ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, আবদুল জলিল মণ্ডলের বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেফতার করে।

আসামির ভূমিকা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আবদুল জলিল মণ্ডল এই মামলার অন্যতম প্রধান কুশীলব। তদন্তে উঠে এসেছে যে, তার পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ নির্দেশেই শাপলা চত্বরের সেই নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটেছে। আমরা এ বিষয়ে আরো গভীর অনুসন্ধান চালাচ্ছি।’

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি আরো জানান, মামলার তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৫ এপ্রিলের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল সাপেক্ষে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) জমা দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব দ্রুতই শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য শুরু করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ যারাই এই ঘটনার পেছনে জড়িত থাকুক, তদন্ত থেকে কেউ বাদ পড়বে না। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকেই আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হবেন।’ শাপলা চত্বরে নিহতের পরিসংখ্যানের বিষয়ে তদন্ত সংস্থা জানায়, এখন পর্যন্ত ১৫-২০ জন নিহত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও তালিকা পাওয়া গেছে। তবে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী শুনানির তারিখের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৩ সালে আবদুল জলিল মণ্ডল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষানীতির বিরোধিতা এবং ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। সেই সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে গভীর রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে তাদের শাপলা চত্বর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

সে সময় মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ দাবি করেছিল ওই অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছেন। তবে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি এবং দিনভর সংঘাত ও সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ১১। ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগ জমা পড়ে, যার ভিত্তিতে বর্তমান আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ

এদিকে, ২০১৫ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। হাসানাত আবদুল্লাহ হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২এ গতকাল মঙ্গলবার সকালে এই অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মো: সহিদুল ইসলাম সরদার। এই মামলার চার আসামির মধ্যে দু’জন বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো: মাহাবুল ইসলাম ও মো: জসিম উদ্দিন কারাগারে আছেন। আর পলাতক আছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগী দুজন হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে হাসানাত আবদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই দুজনকে হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করেন। হাসানাত আবদুল্লাহ ও এহসানউল্লাহ তাদের অধস্তন পুলিশ সদস্যদের দিয়ে ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের বড় ব্রিজের পশ্চিম পাশে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করে।