২০২৫ সালে চা রফতানি কমেছে ৮ লাখ কেজি
Printed Edition
- অনুকূল আবহাওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন
- উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও রফতানিতে মন্দায় চা শিল্প এখন চাপের মধ্যে : বাংলাদেশ চা বোর্ড
- উৎপাদন ও দাম কিছুটা বেড়েছে, তবুও চা শিল্প এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা অ্যাসোসিয়েশন
- দেশের ৭৭ শতাংশ চা উৎপাদন মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে
২০২৫ সালে দেশে চা উৎপাদন বাড়লেও রফতানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত এক বছরে চা রফতানি কমেছে প্রায় ০.৮১ মিলিয়ন কেজি, যা ৮ লাখ কেজিরও বেশি। জানা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চা উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ০১ শতাংশ। উৎপাদনে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও রফতানির নিম্নমুখী ধারা চা শিল্পকে চাপে ফেলেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি)।
বিটিবির সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে চা রফতানি নেমে এসেছে ১ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন কেজিতে, যা ২০২৪ সালে ছিল ২ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন কেজি। একই সময়ে উৎপাদন বাড়লেও তা ২০২৩ সালের রেকর্ড ১০২ মিলিয়ন কেজির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কিছু কিছু বাগানে উৎপাদন কমেছে।
দেশের মোট চা উৎপাদনের বড় অংশ আসে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা থেকে। বিটিবির তথ্য অনুযায়ী, এই দুই জেলাতেই দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ চা উৎপাদিন হয়- এর মধ্যে মৌলভীবাজারে ৫৫ শতাংশ এবং হবিগঞ্জে ২২ শতাংশ। দেশে বর্তমানে ১৬৯টি চা বাগান রয়েছে, যা প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার একরের বেশি এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। চা উৎপাদনের প্রধান মৌসুম জুন থেকে নভেম্বর।
চা বোর্ড জানিয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হলেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং রফতানি বাজারে মন্দা শিল্পটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চায়ের বার্ষিক চাহিদা এখন ৮৫ থেকে ৯০ মিলিয়ন কিলোগ্রামে পৌঁছেছে। ফলে রফতানিযোগ্য উদ্বৃত্ত অনেকাংশে কমে যাচ্ছে।
বিটিবির সদস্য মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে বাংলাদেশী চা আন্তর্জাতিক বাজারে কেনিয়া ও চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অর্থোডক্স ও গ্রিন টির মতো প্রিমিয়াম চা তুলনামূলক ভালো বিক্রি হলেও সাধারণ চায়ের দাম বেশি হওয়ায় রফতানি এখন বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি পুরনো ভূমি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, দুর্বল সেচব্যবস্থা ও মৌসুমি খরাকে উৎপাদনের অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ইস্পাহানি গ্রুপের চা বাগানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, ২০২৫ সালে সব অঞ্চলে উৎপাদন সমান হয়নি; কারণ আবহাওয়ার তারতম্য ছিল। তার মতে, নিলামে কেজিপ্রতি ২১০ থেকে ২৭০ টাকা ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করায় ক্রেতাদের অংশগ্রহণ কমেছে, যা রফতানি হ্রাসের আরো একটি কারণ।
বেঙ্গল চা ব্র্যান্ডের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর লুৎফুল কবীর শাহীন বলেন, চারা বেঁচে থাকার হার বেশি থাকায় উৎপাদন বেড়েছে। তবে উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। তার মতে, পূর্বাঞ্চলে প্রিমিয়াম চা উৎপাদন বাড়ছে, আর উত্তরাঞ্চলের বাগানগুলো উন্নয়নশীল হওয়ায় আগামী ৫ থেকে ৭ বছরে সেখানে উৎপাদন বাড়তে পারে।
শিল্পটির আরেক শীর্ষ কর্মকর্তার ভাষ্য, চোরাচালান কমে যাওয়ায় দেশে চায়ের চাহিদা বেড়েছে এবং ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গড় নিলাম মূল্য কেজিতে প্রায় ৪০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে বিক্রি রফতানির তুলনায় বেশি লাভজনক হয়েছে।
বাংলাদেশ চা অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কামরান তানভীরুর রহমান বলেন, উৎপাদন ও দাম কিছুটা বাড়লেও শিল্পটি এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও শ্রমের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু চায়ের দাম সেই হারে বাড়ছে না। তার সতর্কতা-চায়ের স্থিতিশীল ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে অনেক চা বাগানের জন্য এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, ১৯৭২ সালে যেখানে দেশের চা উৎপাদন ছিল প্রায় ৩০ মিলিয়ন কেজি, ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১০২ মিলিয়ন কেজিতে পৌঁছেছে। আগে উৎপাদনের বড় অংশ রফতানি হলেও গত এক দশকে দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে রফতানি কমেছে। তবে বাড়তি উৎপাদনের সদ্ব্যবহারে রফতানি বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে চা শিল্প আবারো গতি পেতে পারে।