ইরানে হামলা না করতে রাজি ট্রাম্প

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টায় সৌদি-কাতার-ওমান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সঙ্ঘাত এড়াতে শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক চালে সফল হয়েছে উপসাগরীয় তিন দেশ। ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলা ঠেকাতে এবং তেহরানকে সদিচ্ছা প্রমাণের আরেকটি সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান।

এই দেশগুলো আশঙ্কা করছিল যে, ইরানে হামলা চালানো হলে পুরো অঞ্চলে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৌদি আরবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এএফপিকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বৃহস্পতিবার ওই কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মানাতে তাদের দীর্ঘ সময় ধরে মরিয়া হয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হয়েছে। বড় ধরনের বিপদ সামাল দিতে একটি নির্ঘুম রাত পার করতে হয়েছে তাদের। অর্জিত আস্থা ও বর্তমান ইতিবাচক পরিবেশ ধরে রাখতে এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

ইরান ইস্যুতে এর আগে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেও শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্য পক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের মাধ্যমে তিনি নিশ্চয়তা পেয়েছেন যে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেবে না ইরান। মূলত অনিচ্ছাকৃত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি এড়াতেই উপসাগরীয় দেশগুলো এই মধ্যস্থতা করেছে। ওয়াশিংটনকে তারা জানিয়েছিল, হামলা হলে অঞ্চলে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার পথ খুলে যাবে। এ দিকে পেন্টাগনের নির্দেশে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ও এর সাথে থাকা স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজ নেশনের বরাতে আলজাজিরা বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশ করে।

ইরানে বিক্ষোভ দমনের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার কাতারের একটি প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরিয়ে নেয়া হয়। পাশাপাশি কুয়েত ও সৌদি আরবে থাকা মার্কিন মিশনগুলোর কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন বারবার ইরানে হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল। জবাবে তেহরানও পাল্টা হুমকি দিয়ে জানিয়েছিল, হামলা হলে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন জাহাজ ও ঘাঁটিতে আঘাত হানা হবে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে। তেহরানকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনায় কোনো হামলা চালানো হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ইরানের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

গালফ বিশ্লেষক আন্না জ্যাকবস খালাফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রচলিত যোগাযোগ চ্যানেলগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারছিল না, ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।’ দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট ছিল না। এই অনিশ্চয়তাই তাদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করেছে।’

ইরানে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে শতাধিক নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরান। বিপরীতে বিরোধী পক্ষের দাবি, নিহত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সহায়তা আসছে।’ তিনি কী ধরনের হামলার কথা ভাবছেন তা স্পষ্ট না করলেও, এই বক্তব্যই গোটা অঞ্চলকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বাধ্য করেছে। আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর আশঙ্কা, ইরানে হামলা হলে তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়বে, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নষ্ট হবে এবং ইরান পাল্টা আঘাত হানতে পারে তাদের ভূখণ্ডে।

এর আগে ২০১৯ সালে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হাউছিদের হামলায় সৌদি আরবের তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরান কাতারের আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়।

একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ‘ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে আগেই সতর্ক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে এসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হবে। এর পরপরই কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন কর্মী প্রত্যাহার করা হয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের নেতৃত্ব দুর্বল দেখতে আপত্তি না করলেও, হঠাৎ শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কে বা কী সেই শূন্যতা পূরণ করবে- এটাই তাদের সবচেয়ে বড় ভয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর দেশটির পতন, গৃহযুদ্ধ, আলকায়েদা ও আইএসের উত্থান- এই অভিজ্ঞতা আরেকটি বড় দেশে দেখতে চায় না উপসাগরীয় শক্তিগুলো। খালাফ বলেন, ‘তারা বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা চায় না। বরং আরো উগ্র শক্তি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই তাদের বেশি আতঙ্কিত করে।’

কাতার, কুয়েত ও ওমান দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সাথে সহাবস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছে। কাতার তো ইরানের সাথে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রও ভাগাভাগি করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ইরানের অন্যতম বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। ফলে ইরানে অস্থিরতা হলে আমিরাতও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বৈরী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে- তা বাস্তববাদী রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব তার উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক সংস্কার ও পর্যটন পরিকল্পনার কারণে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য স্থিতিশীলতা ও শান্তি, যাতে আমরা আমাদের জনগণের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।’ তবে সৌদি বিশ্লেষক খালেদ বাতারফি বলেন, ‘ধীরে ও নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন হলে তা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু হঠাৎ শাসন পরিবর্তন ও রাষ্ট্র ভেঙে পড়া- এটা কারো জন্যই ভালো হবে না। গোটা অঞ্চল আগুনে পুড়ছে, আমরা আরেকটি আগুন দরজায় চাই না।’