সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী
ব্লু ইকোনমি, ৫ লাখ নিয়োগ ই-হেলথ কার্ড ও প্রাথমিক শিক্ষায় বড় উদ্যোগ
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ, সবার জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’, ব্লু ইকোনমি উন্নয়নসহ নানা খাতে বিস্তারিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার- এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব উদ্যোগ তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
সংসদ সদস্য মো: শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় জনগণকে ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী- এই পাঁচ জেলার মানুষকে এ কার্ডের আওতায় এনে চিকিৎসাসেবা দেয়া হবে। ই-হেলথ কার্ডটি একটি ইলেকট্রনিক রোগী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত থাকবে।
তিনি আরো জানান, ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ১৬ মার্চ থেকে খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জুন ২০২৬-এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১২০৪ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় কাবিখা, কাবিটা ও টিআর কর্মসূচির মাধ্যমে আরো ১৫০০ কিলোমিটার খাল সংস্কার করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি ৫০ লাখ চারা উৎপাদন করা হয়েছে, যা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে। স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
শিক্ষা খাতে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ অর্থবছরেই দুই লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে দুই হাজার ৩৩৬টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও আট হাজার ২৩২টি মাদরাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
খেলাধুলার উন্নয়নে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় যথাক্রমে ৮ ও ১০ বিঘা করে খেলার মাঠ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। একই সাথে হাইটেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টার কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং দেশে পেপ্যাল সেবা চালুর লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া ভাতা চালুর তথ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এ সুবিধার আওতায় আনা হবে; ইতোমধ্যে প্রথম ধাপে ১২৯ জনকে ভাতা দেয়া হয়েছে।
বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের সীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। বিশেষ করে জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় নথির ভিত্তিতে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
সরকারি নিয়োগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দফতরে শূন্য পদে দুই হাজার ৮৭৯ জন নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন কর্মসূচি : প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ শুরু হবে। বর্তমানে দেশে তিন লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৯ জন প্রাথমিক শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে এক লাখ ৩০ হাজার শিক্ষক ইতোমধ্যে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। নতুন কর্মসূচির আওতায় বাকি শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
ব্লু ইকোনমি নিয়ে পরিকল্পনা : বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতির বিকাশে সরকার কাজ করছে। প্রয়োজনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্লু ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নদীভাঙন ও খাল খনন : নদীভাঙন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি দেশের বহু অঞ্চলের দীর্ঘ দিনের সমস্যা। নদী শাসন কার্যকর হলেও ব্যয়বহুল হওয়ায় খাল খননকে তুলনামূলক কম ব্যয়ের সমাধান হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার- সবই সম্ভব হবে।
কুয়াকাটা উন্নয়ন পরিকল্পনা : কুয়াকাটা পর্যটন উন্নয়নে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পায়রা-কুয়াকাটা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ইকোট্যুরিজম ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তবে সেখানে বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হলে সরকারি অর্থ ব্যয় যুক্তিযুক্ত হবে না; বেসরকারি উদ্যোগ এলে সরকার সহায়তা দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ৩০ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি চারটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন। এ ছাড়া সাতটি প্রশ্নের লিখিত উত্তর প্রদান করেন।
তিনি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বৃক্ষরোপণ এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও ক্রীড়াবিদদের জন্য বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন।