সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এনসিপির
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে অভিযোগ
Printed Edition
হারুন ইসলাম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যখন সরগরম, ঠিক তখনই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তারা। দলটির নেতাদের অভিযোগ, সারা দেশে নির্বাচনের জন্য কোনো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ অর্থাৎ সমান সুযোগের পরিবেশ নেই। বরং পুরনো কায়দায় কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা চলছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ধারণ করে গঠিত এই নতুন রাজনৈতিক দলটি মনে করছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারের স্পিরিট ধারণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে দলীয়করণের যে সংস্কৃতি বিগত দিনে ছিল, তা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে।
এ ব্যাপারে দলটির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ইসি যদি তাদের বর্তমান আচরণ পরিবর্তন না করে এবং নির্বাচনকে একপক্ষীয় করার চেষ্টা চলে, তবে আমরা আবারো রাজপথে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো। এর আগে, দলীয় প্রতীকের ব্যাপারে ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছিল তারা। গতকাল দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। বৈঠকে এনসিপির একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। সেখানে তারা নির্বাচনের বর্তমান পরিবেশ, মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা এবং জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।
আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইসহ সামগ্রিক কাজে ইসির আচরণে স্পষ্ট পক্ষপাত দেখা যাচ্ছে। আমরা আশা করেছিলাম, গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে একটি অবাধ নির্বাচনের আয়োজন করবে। কিন্তু আমরা দেখছি, তারা পুরনো পথেই হাঁটছে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রার্থীদের সামান্য ভুলের কারণে বাদ দেয়া হচ্ছে, অথচ বড় দলগুলোর এবং বিগত স্বৈরাচারের দোসরদের বড় বড় অপরাধও কমিশনের চোখে পড়ছে না।
আসিফ মাহমুদ আরো বলেন, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। ইসি মুখে নিরপেক্ষতার কথা বললেও কাজে তার প্রতিফলন নেই। মনে হচ্ছে, ভোটের মাঠে কোনো একটি বিশেষ মহলকে ক্ষমতায় আনার জন্য বা সুবিধা দেয়ার জন্য মাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মাঠ প্রশাসনে আস্থার সঙ্কট : এনসিপির অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মাঠ প্রশাসন। দলটির শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা স্থানীয় প্রশাসন বা ডিসি-এসপিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এনসিপির আহবায়ক এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানের মতে, দেশের বিভিন্ন জেলায় এখনো পুরনো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবে প্রশাসন কাজ করছে। তারা নতুন আধিপত্যবাদী শক্তিকে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।
বিশেষ করে, বিভিন্ন জেলার প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপার (এসপি) নির্দিষ্ট কিছু বড় রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করছেন বলে অভিযোগ এনসিপির। দলটির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী আখতার হোসেন বলেন, আমরা ভেবেছিলাম গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হবে। কিন্তু আমরা দেখছি, প্রশাসনে থাকা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নতুন মোড়কে পুরনো আচরণই করছেন। আমাদের প্রার্থীদের ব্যাপারে প্রশাসনিক অসহযোগিতা স্পষ্ট।
কেন্দ্র দখলের আশঙ্কা : এনসিপি আশঙ্কা করছে, এবারের নির্বাচনেও ভিন্ন কৌশলে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা হতে পারে। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, যেহেতু বিগত স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই সুযোগে কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দল স্থানীয় পর্যায়ে পেশিশক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এনসিপির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন প্রযুক্তিগতভাবে যতই আধুনিকায়নের কথা বলুক না কেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত সদিচ্ছা তাদের নেই। এই ভয়ের সংস্কৃতি সাধারণ ভোটারদেরও বিমুখ করতে পারে। যদি ভোটাররা মনে করেন যে তাদের ভোট আগেই দেয়া হয়ে যাবে বা কেন্দ্রে গিয়ে লাভ নেই, তবে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, আমাদের কাছে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিযোগ আসছে। আমাদের প্রার্থীরা ডিসি অফিসে গেলে যথাযথ সহযোগিতা পাচ্ছেন না। অথচ পুরনো রাজনৈতিক দলের নেতারা ভিআইপি প্রটোকল পাচ্ছেন। পুলিশ আমাদের কর্মীদের অহেতুক হয়রানি করছে । প্রচারণায় নামলে বাধা দেয়া হচ্ছে। একে কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে?
তিনি বলেন, সরকার পতনের পর প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার রদবদল হলেও, মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। দলবাজ কর্মকর্তারা এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন এবং তারা তলে তলে নির্দিষ্ট কিছু দলকে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার কাজ করছেন। সিইসির সাথে বৈঠকে এই বিষয়গুলো সুরাহা করার দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
কালো টাকা ও পেশিশক্তির দাপটের অভিযোগ : নির্বাচনী প্রচারণায় কালো টাকার ব্যবহার নিয়েও এনসিপি ইসির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির দাবি, ইসি প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে বড় দলগুলোর প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে শোডাউন করছে, যা নতুন এবং সংস্কারপন্থী দলগুলোর জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে।
এনসিপি মনে করে, এই নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি অংশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসি গতানুগতিক ধারায় নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে সংস্কারের এজেন্ডাগুলো উপেক্ষা করেছে। বিশেষ করে, প্রার্থী যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্ষুদ্র কারণে নমিনেশন বৈধ করার প্রক্রিয়ায় কমিশন নমনীয়তা দেখিয়েছে বলে অভিযোগ দলটির।
তৃণমূল পর্যায় থেকে এনসিপির কর্মীরা অভিযোগ করছেন যে, তাদের নির্বাচনী ক্যাম্প করতে দেয়া হচ্ছে না এবং অনেক জায়গায় তাদের কর্মীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নির্বাচন বয়কটের মতো কঠিন সিদ্ধান্তে যেতে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির বেশ কয়েকজন নেতা যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তেমন কিছু বলা হয়নি।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, জুলাইয়ের শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি করে কোনো নির্বাচন মেনে নেয়া হবে না। কমিশন যদি মনে করে তারা রুটিন ওয়ার্ক করে পার পেয়ে যাবে, তবে তারা ভুল ভাবছে।
ইসির বক্তব্য : যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বারবার আশ্বস্ত করছেন যে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তারা শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখছেন। তবে এনসিপি বলছে, কথার সাথে কাজের মিল নেই।
যদিও এ ব্যাপারে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সব দিক বিবেচনায় কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। যাতে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী অভিযোগ করার সুযোগ না পায়।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ আইন না মানলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এনসিপির এই কঠোর অবস্থান ইসিকে কতটুকু চাপে ফেলবে বা কমিশন তাদের কার্যপদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা দেখার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ কেবল বাড়ছেই।