অংশগ্রহণের বদলে পর্যবেক্ষণে বিনিয়োগকারীরা

পতন সামলে পুঁজিবাজারে সূচকের মিশ্র আচরণ

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দেশের পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক কোনো উন্নতি নেই। মাঝে মধ্যে হঠাৎই উত্থান হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। এই গতিহীনতার জন্য বিনিয়োগকারীদের অনীহাকেই দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই এ মুহূর্তে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। সম্ভবত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে সক্ষম বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এখনো বাজারে তেমন সক্রিয় নন। তাদের বেশিরভাই বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে এবং সাইড লাইনে অবস্থান করা বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হলে সহসাই বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের একজন শীর্ষ নির্বাহী নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার ঘোষণায়। বিভিন্ন হাউজের বিনিয়োগ ছিল এসব ব্যাংকে, যা এখন অনিশ্চিত হয়ে আছে। তা ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি যারা বিভিন্ন প্রয়োজনে পুঁজিবাজারকে সাপোর্ট দিত তারাও একই কারণে বিপুল লোকসানের শিকার। তাই এ মুহূর্তে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই বাজারে আগের মতো বিনিয়োগ সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠানই কমবেশি সমস্যার মধ্যে টিকে আছে। তাই বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া তারা নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

এ অবস্থায় গতকাল সপ্তাহের তৃতীয় কর্মদিবসে এসে পতন কিছুটা থেমেছে দেশের পুঁজিবাজারে। লেনদেন শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয়া দুই বাজারই সূচকের মিশ্র আচরণেই শেষ করেছে লেনদেন। দিনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়া বাজারগুলো মাঝামাঝি সময়ে এসে হারানো সূচক ফিরে পেলেও তা ধরে রাখতে পারেনি। পরবর্তীতে আবারো বিক্রয়চাপের মুখে পড়া বাজারগুলো লেনদেনের শেষ মুহূর্তে এসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এতে দিনশেষে উভয় পুঁজিবাজারেরই প্রধান সূচকের নামমাত্র উন্নতি হয়েছে। তা ছাড়া বিশেষায়িত দুই সূচকের মধ্যে একটির পতন হলেও অন্যটি সামান্য উন্নতি ধরে রাখে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৪ হাজার ৮৬১ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে ৪ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে স্থির হয়। দিনের শুরুতে বিক্রয়চাপের মুখে সূচকটি সামান্য কমে গেলেও পরবর্তীতে তা কাটিয়ে ওঠে। দুপুর ১২টার দিকে সূচকটি দিনের সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮৮৪ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। এ সময় সূচকটির উন্নতি হয় ২৩ পয়েন্টেরও বেশি। তবে লেনদেনের এ পর্যায়ে নতুন করে বিক্রয়চাপ তৈরি হলে বেলা পৌনে ২টায় সূচকটি ফের ৪ হাজার ৮৫৬ পয়েন্টে নেমে আসে। লেনদেনের শেষমুহূর্তে ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি একপর্যায়ে ৪ হাজার ৮৭৭ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করলেও দিনের সমন্বয় শেষে ৪ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে স্থির হয়। এ সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ৩ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হলেও দশমিক ৭৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে ডিএসই শরিয়াহ সূচক। অপর দিকে, দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১ দশমিক ০৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ সূচকটি ৬ দশমিক ৩১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হলেও সিএসসিএক্স সূচক ১ দশমিক ০৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে।

লেনদেনের ক্ষেত্রে দুই পুঁজিবাজারে দুই ধরনের চিত্র দেখা গেছে গতকাল। এদিন ডিএসইতে লেনদেনের কিছুটা উন্নতি হলেও অবনতি হয়েছে সিএসইতে। ডিএসইতে গতকাল ৩৫৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ৪৫ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইতে ৩০৯ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন নেমে আসে ৫ কোটি টাকায়। সোমবার সিএসইতে ১১ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল।

এদিকে গতকালও আগের দিন সোমবারের মতো ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক। ১৩ কোটি টাকায় কোম্পানিটির ৫৩ লাখ ২১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১০ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় তিন লাখ ১৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ওরিয়ন ইনফিউশন ছিল দিনের দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো হচ্ছে যথাক্রমে- সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, উত্তরা ব্যাংক, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, রহিমা ফুড করপোরেশন, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, সায়হাম কটন মিলস ও শাহজিবাজার পাওয়ার।

দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাতের হা ওয়াল টেক্সটাইল। কোম্পানিটির শেয়ারের ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ দাম বেড়েছে গতকাল। ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ দাম বেড়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ইনটেক অনলাইন। ডিএসইতে দাম বাড়ার শীর্ষ ১০ কোম্পানির বাকিগুলো হচ্ছে- সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, ইনফরমেশন সিস্টেমস নেটওয়ার্ক, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, এনভয় টেক্সটাইল, রানার অটোমোবাইলস, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্ট, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স ও এপেক্স স্পিনিং।

ডিএসইতে গতকাল দরপতনের শীর্ষে ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কোম্পানি প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এদিন ১০ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। ডিএসইতে দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে- ফ্যামিলিটেক্স, ফার্স্ট ফিন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বিআইএফসি, অ্যাপোলো ইস্পাত, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ও এল আর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।