সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে পুঁজিবাজার সূচক
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মার ট্রেডিং ফের শুরু
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে মিল রেখেই পুঁজিবাজারে নতুন সপ্তাহ শুরু হয়েছে। আর সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সাম্প্রতিক সময়ের নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচক। ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটি গতকাল পাঁচ হাজার ৭১৯ দশমিক ৭৬ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। ২০২৪ সালের ২৫ আগস্টের পর আর এ অবস্থানে পেঁৗঁছতে পারেনি সূচকটি। একই ঘটনা ঘটেছে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও। গতকাল বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচকটি পৌঁছে যায় ১৫ হাজার ৩৪৬ দশমিক ৫০ পয়েন্টে। বাজারটির জন্য এটিও সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন পুঁজিবাজারগুলো বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুনর্গঠন করার পর এ ধারা বলবৎ থাকলেও দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করলে পুঁজিবাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। এর পরই পুঁজিবাজারে মন্দাভাব তৈরি হয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যাহত থাকে। এ বছরের শুরুর দিকে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুন করে আস্থা তৈরি হলে বাজার আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল আবার নতুন উচ্চতার পৌঁছে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচক।
জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহটিতে পুঁজিবাজারগুলোতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি রেকর্ড করা হলেও গত সপ্তাহের শুরুটা ছিল সংশোধনে। এ সময় দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সব খাতে সংশোধন ঘটে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারদের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও প্রত্যাশা ছিল নতুন সপ্তাহটি তাদের পক্ষেই থাকবে। আর ঘটলও তাই।
গতকাল রোববার লেনদেনের শুরু থেকেই দুই বাজার সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। মাঝেমধ্যে মৃদু বিক্রয়চাপ সক্রিয় থাকলেও তা সূচকের এ প্রবণতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি; বরং ব্যাংকসহ বড় মূলধনের অন্যান্য কোম্পানিও এক পর্যায়ে র্যালিতে যুক্ত হলে সূচকের বড় উন্নতি ধরে রেখেই দিন শেষ করে দুই বাজার।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৬৬ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ৬৫২ দশমিক ৮২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৭১৯ দশমিক ৭৬ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩১ দশমিক ৪১ ও ১৩ দশমিক ৩১ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১৯৭ দশমিক ৩০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে গতকাল। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও ডিসএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২২৪ দশমিক ২৪ ও ১২৮ দশমিক ১৯ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতি গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেদেনকেও প্রভাবিত করে। এদিন বাজারটি এক হাজর ৩৭১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিনের চাইতে ২৬১ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের বড় ধরনের অবনতি ঘটে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ৩৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় গতকাল, যা আগের দিন অপেক্ষা ৫৩ কোটি টাকা কম। বৃহস্পতিবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৯৮ কোটি টাকা।
এ দিকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্টস-এর (জিডিআর) ওপর আরোপিত ট্রেডিং সাসপেনশন প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে শুক্রবার (২৬ জুন) থেকে কোম্পানিটির জিডিআরের লেনদেন পুনরায় শুরু হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্সদের সংগঠন ডিবিএ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রসঙ্গত, দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাসিটিক্যালস পিএলসি একমাত্র কোম্পানি, যেটি ২০০৪ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে তালিকাভুক্ত হয়। নানা জটিলতার কারণে ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদনসমূহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করতে না পারায় ২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কোম্পানিটির জিডিআর লেনদেন স্থগিত ছিল।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সিকিউরিটিজ টানা ছয় মাস স্থগিত থাকলে এবং স্থগিতাদেশের কারণ দূর না হলে তার তালিকাভুক্তি বাতিল হতে পারে। সে অনুযায়ী ২ জুলাই ২০২৬ ছিল নির্ধারিত সময়সীমার শেষ দিন। এ প্রেক্ষাপটে বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির জিডিআর ডি-লিস্টিং রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান বরাবরে পত্র দাখিল করে এবং এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহযোগিতা কামনা করেন।
বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে ডিবিএ দ্রুত বিএসইসি এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানায়।
ডিবিএর উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে বিশেষ বোর্ড সভা আয়োজনের অনুমতি প্রদান করে, যাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক, নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী অনুমোদন ও প্রকাশ করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানির রিপোর্টিং-সংক্রান্ত ঘাটতি দূর হয় এবং লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ ট্রেডিং সাসপেনশন প্রত্যাহার করে শনিবার (২৬ জুন) থেকে জিডিআর লেনদেন পুনরায় চালুর অনুমোদন প্রদান করে।
বেক্সিমকো ফার্মার পাশাপাশি গতকাল বেক্সিমকো লিমিটেডের জন্য ভালো দিন ছিল গতকাল। ৯ জুন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের দিন থেকে টানা ১২টি কর্মদিবস সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরপতনের পর গতকাল কোম্পানিটি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে বেশ কিছু সময় আগের দিনগুলোর মতোই দিনের সর্বনিম্ন দরে লেনদেন হওয়ার পর হঠাৎ করে ঘুর দাঁড়ায় কোম্পানিটি। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পৌঁছে যায় দিনের সর্বোচ্চ দরে। লেনদেনের বাকি সময় এই দরেই লেনদেন হয় কোম্পানিটির শেয়ার। আর এভাবে ১০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় তিন কোটি ৯১ লাখ ৫৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ওঠে আসে কোম্পানিটি।