মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক

বিবি সাওদা গ্রেফতারে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ভোলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারীকর্মী বিবি সাওদা ওরফে সাওদা সুমিকে গ্রেফতারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকাশ করছেন। অনেকেই বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নের সাথে সরাসরি যুক্ত করে দেখছেন। গত রোববার (৫ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে ভোলা পৌরসভা এলাকায় নিজ বাসা থেকে বিবি সাওদাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযোগ করা হয়, তিনি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করেছিলেন। তবে সমালোচনা চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে গতকাল দুপুরে তার জামিন মঞ্জুর করে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক তার পোস্টে লিখেছেন, ‘ভোলার জামায়াতকর্মী বিবি সাওদাকে গ্রেফতারের ঘটনা পুরনো ফ্যাসিবাদী নিপীড়নেরই অনুকরণ। তিন বছরের এক বাকপ্রতিবন্ধী শিশুর মাকে এভাবে বিনা অপরাধে নিজ বাসা থেকে মধ্যরাতে তুলে নেয়া কেবল অমানবিক নয়, বরং ভিন্নমত দমনে নবগঠিত সরকারের সুপ্ত মনোবাসনারই বহিঃপ্রকাশ। যারা একসময় নিজেরাই ফ্যাসিবাদের শিকার ছিলেন, তাদের শাসনামলে এমন অযৌক্তিক গ্রেফতারা ও হয়রানি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে জামায়াতকর্মী বিবি সাওদার মুক্তি ও সকল প্রকার প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি। সরকারের মনে রাখা উচিত, ক্ষমতার দাপটে নিপীড়ন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই শুভ হয় না।’

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ‘থ্রি এস চেম্বার্স’-এর হেড অব চেম্বার ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির লিখেছেন, ‘এক সওদার লিখনীতে কেঁপে উঠলো ক্ষমতার মসনদ। সহ্য করতে পারলেন না। জুলাই জেগে উঠুন। আজাদি তিনি সেচ্ছায় কারাবরণের ঘোষণা দেন ’

গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, ‘বর্তমান সরকার কি হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়? হাসিনার পরিণতি কি এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেছে তারা? বিএনপির সরকার চালায় কারা? সরকারের সমালোচনামূলক একটা পোস্ট শেয়ার দেয়ার কারণে সাঁইত্রিশ বছরের নারীকে গ্রেফতার করার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার কি বার্তা দিতে চায় আমাদেরকে? কিসের জোরে তারা দিন দিন এমন হঠকারিতা আর স্বেচ্ছাচারিতার দিকে ধাবিত হচ্ছে? তারা কি ভাবতেছে তাদের লাগাম টেনে ধরার মতো কেউ নাই?’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল তার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, ‘দেশের বাস্তবচিত্র গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক জনসমক্ষে তুলে ধরার অধিকার রাখেন। এটি তার সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। রাষ্ট্র এ অধিকার হরণ করতে পারে না। এ অপরাধে বিবি সাওদা সুমিকে গ্রেফতার করা ফ্যাসিবাদের পদাঙ্ক অনুসরণের নামান্তর। অবিলম্বে বিবি সাওদা সুমিকে মুক্তি দিতে হবে। কার নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাকেও চিহ্নিত করতে হবে।’

রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘এক পোস্টের জন্য এ ভদ্রমহিলাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একটু আগে তার পোস্ট শেয়ার দিয়েছিলাম এখন আইডিই উধাও। নিঃশর্ত মুক্তি চাচ্ছি সালাহউদ্দিন সাহেব! পূর্বের থেকে শিক্ষা নেন।’

পুলিশের বক্তব্য

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন শাখার উপপরিদর্শক (এসআই) জুয়েল হোসেন খানের দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিজের ফেসবুক আইডি থেকে বিবি সাওদা সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করেছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তাদের নির্দেশে বিবি সাওদাকে গ্রেফতার করা হয়।

আদালতে দাখিল করা আবেদনে এসআই জুয়েল হোসেন খান উল্লেখ করেন, বিশ্বস্ত সূত্রে এবং সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে জানতে পারি বিবি সাওদা তার ব্যবহৃত ‘রেডমি নোট ৯’ মোবাইল ফোনে লগইনকৃত ফেইসবুক আইডি ‘সাওদা সুমি’ থেকে রাষ্ট্র এবং সরকারবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে এবং নির্দেশনা প্রাপ্ত হয়ে বিবি সাওদার হেফাজত থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।

আবেদনে বলা হয়, বিবি সাওদা সরকার, রাজনীতি, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সম্পর্কে বিভিন্ন পোস্ট করেছেন।

পুলিশ জানায়, মোবাইল ফোনটির কারিগরি সমস্যার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত পর্যালোচনা সম্ভব হয়নি এবং ফোনটি জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বলা হয়, বিবি সাওদা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ শাস্তিযোগ্য অপরাধের সাথে জড়িত সন্দেহ হওয়ায় তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।

জামায়াতের বিবৃতি

ঘটনার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে উদ্বেগ ও নিন্দা জানায়। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, ভোলা পৌরসভা মহিলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বিবি সাওদাকে নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করার ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতামত : অতীতের শিক্ষা কী বলে?

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন নয়। তারা মনে করেন, বিগত সরকারের আমলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। অতীতে দেখা গেছে, সমালোচনা দমনের চেষ্টা জনগণের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগের সরকারের সময়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের কারণে গ্রেফতারের বহু ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। এতে দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল এবং নাগরিকদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি একই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে তা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য নেতিবাচক বার্তা দেবে। সরকারকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংযম ও স্বচ্ছতা দেখাতে হবে।

জামিন মঞ্জুর

এ দিকে ভোলায় আটককৃত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা কর্মী বিবি সাওদা (৩৭) ওরফে সাওদা সুমির জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ভোলা সদর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সৌরভ রায় মিঠু উভয়পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইলিয়াস সুমন জানান, গত রোববার (৫ এপ্রিল) রাতে ভোলা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ একাডেমি সড়কের একটি বাসা থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে সাওদা সুমিকে আটক করে পুলিশ। পরে দণ্ডবিধির ৫৪ ধারায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি আরো বলেন, মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টার শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।

বিবি সাওদার গ্রেফতার শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয় এটি এখন বৃহত্তরভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে চলমান বিতর্ক এবং বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও আলোচনা ও রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে পারে।এতে সরকারকে বিপাকে পড়তে পারে বলছেন বিশ্লেষকরা।