বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে মানুষের প্রকৃত আয়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়; কিন্তু মানুষের আয় সেই তুলনায় বাড়ছে না। এই বাস্তবতা এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয়ের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত করে ফেলেছে। কাগজে-কলমে আয় কিছুটা বাড়লেও বাস্তবে সেই আয় দিয়ে আগের মতো জীবন চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, দেশে দীর্ঘ দিন ধরেই মূল্যস্ফীতি মানুষের আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যার ফলে প্রকৃত আয় বা বাস্তব ইনকাম ধারাবাহিকভাবে কমছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল সাড়ে ৭ শতাংশের কাছাকাছি এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য ছাড়াও বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। শহরাঞ্চলে এই চাপ আরো তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে, যেখানে বাড়িভাড়া ও যাতায়াত ব্যয় গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি ও মাছ-গোশতের মতো নিত্যপণ্যের দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। বাজারে এক কেজি মুরগি, ডিম বা সাধারণ সবজির দাম এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও হিসাব করে কিনতে হয়। এক দিকে খাদ্য ব্যয় বাড়ছে, অন্য দিকে রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিলও নিয়মিত বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাসাভাড়া বৃদ্ধির হার অনেক ক্ষেত্রেই আয়ের বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে মাঝারি মানের একটি বাসার ভাড়া গত দুই-তিন বছরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে ভাড়াটিয়ারা অভিযোগ করছেন।

অন্য দিকে আয় বৃদ্ধির চিত্র তুলনামূলকভাবে অনেক ধীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের মজুরি গড়ে ৮ শতাংশের কিছু বেশি বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি এর চেয়ে বেশি থাকায় প্রকৃত অর্থে মানুষের আয় বাড়েনি; বরং কমেছে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি নেগেটিভ রিয়াল ইনকামের পরিস্থিতি। গত চার বছরের বেশি সময় ধরে টানা এমন পরিস্থিতি চলছে, যেখানে মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সাথে তাল রাখতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষ যেমন সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি চাকরিজীবী, গার্মেন্টস শ্রমিক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়লেও তা বছরে ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কার্যত কোনো স্বস্তি দিচ্ছে না। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও সর্বশেষ বেতনকাঠামোর পর নতুন করে বড় ধরনের সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

তারা বলছেন, এই আয়-ব্যয়ের বৈষম্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা ছোট করছে, পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে সস্তা বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে। চিকিৎসা ব্যয় কমাতে নিয়মিত চেক-আপ বা প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা থেকে বিরত থাকছেন অনেকে। বেসরকারি স্কুল-কলেজে পড়ুয়া সন্তানদের শিক্ষাব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অভিভাবকদের। কোথাও কোথাও সন্তানদের কোচিং বা অতিরিক্ত পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশ এখন সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। আগে যেখানে মাস শেষে কিছু টাকা জমাতে পারতেন, এখন সেখানে মাসের শেষ দিকে ধার করতে হচ্ছে। ব্যাংক ঋণ, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নেয়া ধার বা ক্রেডিটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা দুটোই হুমকির মুখে পড়ে।

এ দিকে গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি খুব একটা আলাদা নয়। কৃষিশ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের আয় কিছুটা বাড়লেও সার, বীজ, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। কৃষিপণ্য বিক্রি করে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে পারিবারিক ব্যয় মেটাতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবার এখন মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় করছে, ফলে শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে খরচের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার কথা বললেও বাজারে তার প্রভাব খুব সীমিত। টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, আমদানি শুল্ক সমন্বয় বা বাজার মনিটরিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেয়া হলেও সার্বিক বাজারে দামের চাপ কমেনি। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব প্রায় সব পণ্যের দামের ওপর পড়ছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম ওঠানামা করলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার প্রতিফলন সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, শুধু নামমাত্র আয় বাড়ানো যথেষ্ট নয়; মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত না হলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলছেন, মজুরিকাঠামো পুনর্বিবেচনা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি। একই সাথে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে টেকসই আয় বৃদ্ধির পথ তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সঙ্কটের রূপ নিচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় মানুষের জীবনমান অবনমন হচ্ছে, বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও আর্থিক চাপ। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে এই চাপ আরো তীব্র হতে পারে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নীতিনির্ধারকরা এই বাস্তবতা আমলে নিয়ে এমন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে মানুষ আর্থিকভাবে আরো বিপর্যস্ত না হয়।