সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ও এসডিএফ নেতার বৈঠক
Printed Edition
আলজাজিরা ও রয়টার্স
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) প্রধান মাজলুম আবদির সাথে বৈঠক করেছেন। কয়েকদিনের সংঘর্ষে সরকারি সেনা ও মিত্র উপজাতি বাহিনী আলেপ্পো থেকে রাক্কা পর্যন্ত উত্তরাঞ্চল দখল করার পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গত রোববার আবহাওয়ার কারণে স্থগিত হওয়া বৈঠকটি গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ পুনর্দখল করে, ফলে এসডিএফকে যুদ্ধবিরতি ও একটি বিস্তৃত চুক্তি মেনে নিতে হয়। এতে কুর্দি বেসামরিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আনা হয়েছে। দামেস্ক থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক আইমান ওগান্না জানান, যুদ্ধবিরতি চুক্তি রাজধানীতে জনসাধারণের মধ্যে আনন্দের ঢেউ তোলে। তিনি বলেন, চুক্তি হওয়ার পর রাতে রাস্তায় আতশবাজি, গাড়ির হর্ন আর নাচগানে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। তবে অনেকেই সতর্কতার সাথে আনন্দ প্রকাশ করেছেন, কারণ দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ওগান্না জানান, সাধারণ মানুষ এখন শান্তি চায়। দামেস্কে কুর্দিদেরও একই প্রত্যাশা সঙ্ঘাতের অবসান ও কূটনৈতিক সমাধান। তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ৯০ শতাংশ সিরিয়ান দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এবং তারা আশা করছে শান্তি ফিরলে পুনর্গঠনে মনোযোগ দেয়া যাবে। এসডিএফ নেতা আবদি জানান, রক্তপাত ঠেকাতে ও গৃহযুদ্ধ এড়াতে তাদের বাহিনী দেইর আজ জোর ও রাক্কা থেকে হাসাকায় সরে গেছে। তিনি স্বীকার করেন, এসডিএফ বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে, তবে অর্জিত সাফল্য রক্ষায় তারা প্রস্তুত। এসডিএফ কমান্ডার সিপান হামো রয়টার্সকে বলেন, তারা সিরিয়া থেকে আলাদা হতে চায় না। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষের নিশ্চয়তা চান। তিনি ইরান বা রাশিয়ার সহায়তা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন, তবে ইসরাইল সিরিয়ার কুর্দিদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানায়, যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে এসডিএফ যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং রাক্কা, দেইর আজ জোর ও হাসাকায় সরকারি কর্তৃপক্ষ মোতায়েন করা হবে। আল-শারা বলেন, এসডিএফকে সেনাবাহিনীতে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করা হবে এবং উপজাতি বাহিনীকে চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে হবে। আলেপ্পো থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক জেইন বাসরাবি জানান, এখন দৃষ্টি যাচ্ছে নতুন দখলকৃত এলাকায় সরকারের শাসনব্যবস্থা কেমন হবে তার দিকে। তিনি বলেন, আল-শারা ও আবদির বৈঠক চুক্তির অস্পষ্ট বিষয়গুলো পরিষ্কার করবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মাঠপর্যায়ে। আগামী কয়েকদিনে সরকারকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকারি বাহিনী এখন প্রধান শক্তি হয়ে ওঠায় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেয়া তাদের দায়িত্ব। সামরিক অভিযানকে বেসামরিক পুলিশি ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে এবং প্রতিশোধ এড়িয়ে অঞ্চলকে জাতীয় অর্থনীতির সাথে যুক্ত করতে হবে। বৈরুত থেকে বিশ্লেষক জো ম্যাকারন বলেন, তেল ও গ্যাস সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া সিরিয়ার জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা। তবে তাৎক্ষণিক লাভ আসবে না। অবকাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসডিএফ যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। কারণ তাদের মধ্যে বিদেশী যোদ্ধাও রয়েছে। তিনি বলেন, আলোচনার গতি এখন দামেস্কের পক্ষে। আল-শারা চান যোদ্ধারা ব্যক্তিগতভাবে যোগ দিক, যাচাই শেষে। এ ছাড়া উপজাতি রাজনীতি এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। রোববার দামেস্কে আল-শারা মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাকের সাথে বৈঠক করেন। ব্যারাক বলেন, এই চুক্তি সিরিয়ার ঐক্যের পথে নতুন অধ্যায় খুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র উত্তরাঞ্চলে সেনা মোতায়েন রেখেছে এবং আইএসআইএলের (আইএসআইএস) পুনরুত্থান ঠেকাতে মনোযোগ দিচ্ছে। সম্প্রতি পালমিরায় হামলায় দুই মার্কিন সেনা ও এক বেসামরিক অনুবাদক নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারের অভিযান চালায়।
সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। এতে বেসামরিকদের নিরাপদে ঘরে ফেরার সুযোগ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আবার কাজ শুরু করতে পারবে। চুক্তিটি এসডিএফের সাথে আগের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দিনের সামরিক অভিযানে পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল পুনর্দখলের মাধ্যমে আসে। এ দিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান আল-শারার সাথে ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, সিরিয়া থেকে সন্ত্রাসবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল করা জরুরি। তুরস্ক দীর্ঘ দিন ধরে এসডিএফকে বিরোধিতা করছে, কারণ তারা এটিকে পিকেকের অংশ মনে করে, যা তুরস্কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত।