সংশোধনীসহ অর্থ আইন ২০২৬ পাস হচ্ছে আজ

আয়করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি খুচরো ব্যবসায় ভ্যাট প্রত্যাহার, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলায় টিআইএনের বাধ্যবাধকতা থাকছে না

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে ব্যক্তি শ্রেণী আয়করমুক্তের সীমা আরো খানিকটা বাড়াচ্ছে সরকার। গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর মুক্তের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। এবার তা আরো ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হতে পারে। ফলে কারো বার্ষিক আয় চার লাখ টাকা থাকলে তাকে কোনো আয়কর দিতে হবে না।

শুধু তাই নয়, আগামী দুই অর্থবছরের জন্য (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮) করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হচ্ছে। একই সাথে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থেকেও সরে আসছে সরকার। একই সাথে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

আর এই সব সংশোধনীসহ আজ সোমবার জাতীয় সংসদে ‘অর্থ আইন-২০২৬’ অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উত্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, রাতে অর্থ বিল পাসের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সমাপনী বক্তব্য রাখতে পারেন। সেই বক্তব্যে তিনি আয়করমুক্তের সীমা বাড়ানোসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব সংশোধনের কথা বলতে পারেন। সেখানে কর কমানো বা প্রত্যাহারের কথাও থাকবে। সেই প্রস্তাবগুলো অর্থমন্ত্রী তার অর্থবিলে সংযোজন করে জাতীয় সংসদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে চার লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করা হতে পারে।

এ দিকে, এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি বাদ দেয়া হতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বিভিন্ন মহল থেকে এর বিরোধিতা করা হয়। তাদের মতে, এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

তিনি জানান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (বিটুবি) লেনদেনে শূন্য দশমিক দুই শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের যে প্রস্তাব বাজেটে দেয়া হয়েছিল, সেটি অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

এ ছাড়া সরকার সোনার ওপর মূলধনী লাভ কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) বর্তমান ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে।

প্রস্তাবিত অর্থবিলে করদাতার রিটার্নে ঘোষিত সোনা, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, প্রাচীন নিদর্শন ও ক্লাব সদস্যপদ বিক্রি বা হস্তান্তর থেকে অর্জিত লাভকে মূলধনী লাভ হিসেবে গণ্য করে ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

এ ছাড়া ট্রেজারি বিল, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ডিবেঞ্চার, সুকুক ও অন্যান্য শরিয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজ এবং বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও স্টক বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনী লাভের ওপরও ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সোনা ও গহনা বিক্রির লাভের ওপর কর আরোপের এই প্রস্তাব এসেছে।

আরেকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করপোরেট করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা।

বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও শুধু আইসিটি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ করপোরেট কর প্রযোজ্য।

তবে আবাসন খাতের ডেভেলপারদের কর ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেই বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ওপর ‘স্পেসিফিক ভ্যাট’ নামে প্যাকেজ আকারে যে নতুন ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা ছিল, তা থেকে সরে আসতে পারে সরকার। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে প্রস্তুতির ঘাটতি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

৫০ লাখ টাকার নিচে বার্ষিক বিক্রি বা টার্নওভার রয়েছে, এমন ব্যবসায়ীদের এলাকাভেদে বিভিন্ন ভাগে এই স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপের পরিকল্পনা ছিল এনবিআরের। তাদের খুব সহজে ভ্যাট নিবন্ধন দেয়া এবং ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কর্তন করার পরিকল্পনা করেছিল এনবিআর। এ লক্ষ্যে একটি নতুন বিধিমালা জারি করারও কথা ছিল।

এই ভ্যাট হওয়ার কথা ছিল প্রতি মাসে এক হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনা চলাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মুদি দোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকানসহ ১৬টি খুচরা ও সেবামূলক খাতকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ‘স্পেসিফিক ট্যাক্স’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এই স্পেসিফিক ট্যাক্স একধরনের প্যাকেজ ভ্যাট, যা আগে চালু থাকলেও পরে বাতিল করা হয়েছিল।