হাবিবুর রহমান সাগর
বাংলাদেশের নগরজীবনে একসময় ‘কিশোর’ শব্দটি ছিল সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই শব্দের সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগজনক পরিচয়- ‘কিশোর গ্যাং’। সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সমাজের জন্য এক ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ইভটিজিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, এমনকি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তির পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত নানা উপাদান একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে এ সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।
প্রথমত, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা একটি বড় কারণ। নগরায়ন, কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে অনেক বাবা-মা সন্তানের সাথে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার বিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা দীর্ঘ সময় অভিভাবকের অনুপস্থিতি কিশোরদের মানসিকভাবে একাকী করে তোলে। তারা তখন পরিবার নয়, সমবয়সী বন্ধুদের কাছেই নিরাপত্তা ও পরিচয়ের অনুভূতি খুঁজে পায়। সেই বন্ধুত্বই অনেক সময় গ্যাংয়ে রূপ নেয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কমে গেছে। সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা কিংবা নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সঙ্কুুচিত হওয়ায় কিশোরদের সৃজনশীল শক্তি ইতিবাচক পথে পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে তারা বিকল্প পরিচয় খুঁজে নেয় গ্যাং অপসংস্কৃতির মধ্যে।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। অনেক কিশোর সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ‘ক্ষমতাবান’, ‘ভয়ঙ্কর’ বা ‘প্রভাবশালী’ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। অস্ত্র প্রদর্শন, মারামারির ভিডিও, গ্যাংয়ের নামে ফেসবুক গ্রুপ বা টিকটক ভিডিও তাদের কাছে একধরনের জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ভার্চুয়াল পরিচিতি বাস্তব জীবনের অপরাধকে উৎসাহিত করে।
চতুর্থত, মাদক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতাও কিশোর গ্যাং বিস্তারের অন্যতম কারণ। অনেক এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অপরাধচক্র নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করে। তারা কিশোরদের দিয়ে মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক শোডাউন কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজ করায়। বয়স কম হওয়ায় তারা মনে করে, আইনের শাস্তিও তুলনামূলক কম হবে।
শুধু অপরাধপ্রবণতা দিয়ে কিশোর গ্যাংকে ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেক কিশোরের জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বড় ভূমিকা রাখে। যখন একজন তরুণ দেখে যে কঠোর পরিশ্রম করেও সম্মানজনক সুযোগ পাওয়া কঠিন, অথচ অপরাধের মাধ্যমে অর্থ, ক্ষমতা কিংবা পরিচিতি অর্জন সম্ভব, তখন সে সহজ পথের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে।
বিশেষ করে শহরের বস্তি, নিম্ন আয়ের পরিবার কিংবা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ছে; অর্থাৎ এটি আর কেবল দারিদ্র্যের সমস্যা নয়; এটি মূল্যবোধের সঙ্কটও।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান, গ্রেফতার কিংবা বিশেষ অভিযান প্রয়োজনীয় হলেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশে ‘রিস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা পুনর্গঠনমূলক বিচারব্যবস্থা কিশোর অপরাধ কমাতে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
প্রতিটি কিশোরের প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্ট দেখছে কিংবা মানসিকভাবে কী অবস্থায় রয়েছে- এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শুধু অর্থ উপার্জন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে জোর দিতে হবে। বিতর্ক, খেলাধুলা, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা ইতিবাচক নেতৃত্বের সুযোগ পাবে।
প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন কিংবা মহল্লাভিত্তিক কিশোর উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সামাজিক সংগঠন ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। খেলার মাঠ, পাঠাগার, যুবকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
অন্য দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধমূলক কনটেন্ট ছড়ানো, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা গ্যাং প্রচারণার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়িয়ে কিশোরদের দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল অপরাধের খবর প্রকাশ করা নয়; সমস্যার কারণ অনুসন্ধান এবং সমাধানের পথও তুলে ধরা। কিশোর অপরাধের সংবাদ পরিবেশনের সময় এমন ভাষা বা উপস্থাপনা এড়িয়ে চলতে হবে, যা অন্য কিশোরদের কাছে গ্যাং সংস্কৃতিকে আকর্ষণীয় বা বীরত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে। একই সাথে ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্প, সফল পুনর্বাসনের উদাহরণ এবং তরুণদের অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ বেশি করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে কিশোরদের হাতে অস্ত্র নয়, বই; ভয় নয়, আত্মবিশ্বাস; গ্যাং নয়, নেতৃত্বের ইতিবাচক সুযোগ তুলে দিতে হবে। কারণ আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের হারিয়ে ফেলা মানে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া।
লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।