নীতিমালার খসড়া প্রকাশের দাবি জামায়াতের

জ্বালানি তেল বেসরকারীকরণের উদ্যোগ লুটপাটের লাইসেন্স

Printed Edition
first-2
মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার সরকারি উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি অভিযোগ করেছে, এ সিদ্ধান্ত কোনো খাত সংস্কার নয়, বরং একচেটিয়া দুর্নীতি ও লুটপাটের নতুন লাইসেন্স। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে এবং পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে।

গতকাল রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপের বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আ ন ম শামছুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো: আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো: শাহাবুদ্দিন, ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি।

লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আজ আমরা আপনাদের সামনে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এসেছি, যেটি নিয়ে সরকার প্রকাশ্যে কথা বলছে না। চলছে ষড়যন্ত্র, নথির আড়ালে ও বন্ধ দরজার ভিতরে। বিষয়টি হচ্ছে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার নতুন নীতিমালা তৈরির প্রসঙ্গ। অথচ এ সিদ্ধান্তের চড়া মূল্য দিতে হবে প্রতিটি মানুষকে, প্রতিটি বাসের ভাড়ায়, প্রতিটি সেচপাম্পের ডিজেলে, প্রতিটি চালের বস্তার দামে।

তিনি বলেন, হঠাৎ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়ার পর জ্বালানি খাতকে বেসরকারি কোনো শিল্প গ্রুপের হাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ আরো একধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই : এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ‘অদক্ষ ও লোকসানি’ দেখিয়ে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করার যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরকারি ও স্বাধীন গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসির নিট মুনাফা ছিল তিন হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে নিট মুনাফা হয়েছে দুই হাজার ৫০ কোটি টাকা। যে প্রতিষ্ঠান পরপর দুই অর্থবছরে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিচ্ছে, তাকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরো বলেন, বিপিসির চেয়ারম্যান বদলির চার দিনের মাথায় খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেয়া এবং আগামী সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জ্বালানি আমদানির দরপত্র জমা দেয়ার সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১০ দিন করা হয়েছে। সময়সীমা অস্বাভাবিক কমানোর ফলে আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীরা অংশ নিতে পারবে না, যা নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করবে।

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, দেশে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো (গভীর সমুদ্রবন্দর, ট্যাঙ্কার, পাইপলাইন) হাতেগোনা ৩-৪টি গ্রুপের রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে গঠিত হবে নিয়ন্ত্রণহীন ‘বেসরকারি একচেটিয়া’। বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বাজারে প্রতি লিটারে মাত্র এক টাকা বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার আইনি লুণ্ঠনে পরিণত হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা অলাভজনক রুটে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রাখলে রাষ্ট্রীয় সঙ্কট তৈরি হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। একই সাথে শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা রহিত করে জ্বালানি খাতের শ্রমিক নেতাদের আইনি সুরক্ষা কাড়ার চক্রান্তের তীব্র সমালোচনা করে অবিলম্বে এ সংক্রান্ত সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

বেসরকারি খাতে রূপান্তরের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ড. এম শামসুল আলম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশাহিদা সুলতানা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জ্বালানি কোনো মুনাফার পণ্য নয়। এলপিজি খাতে বেসরকারি সিন্ডিকেটের দরুন সাধারণ মানুষ নির্ধারিত দামে গ্যাস পাচ্ছে না; পেট্রোল-ডিজেলেও একই মডেল চালু হলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সরাসরি ৭টি প্রশ্ন তোলা হয়: ১. বেসরকারি খাতে জ্বালানি আমদানির খসড়া নীতিমালা প্রক্রিয়াধীন আছে কি না? ২. খসড়া নীতিমালাটি অবিলম্বে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে কি না? ৩. কোন সমীক্ষা ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত? ৪. কোন কোন কোম্পানি ইতোমধ্যে আবেদন করেছে? ৫. দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে ১০ দিনে নামানোর কারিগরি ভিত্তি কী? ৬. ভোক্তাপর্যায়ের দাম বিইআরসি নাকি বেসরকারি কোম্পানি নির্ধারণ করবে? ৭. বিগত পতিত সরকারের আমলে দেয়া বেসরকারি অনুমোদনের পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে কি না?

জামায়াতে ইসলামীর ছয় দফা দাবি : বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জামায়াতে ইসলামী সরকারের কাছে ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছে : ১. পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার সব প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা। ২. খসড়া নীতিমালার নথি উন্মুক্ত করে সাধারণ মানুষের মতামতের জন্য অন্তত ৬০ দিন সময় দেয়া। ৩. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে বিরোধী দল, বিশেষজ্ঞ, সিপিডি, ক্যাব ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে শুনানির ব্যবস্থা করা। ৪. স্বাধীন নিরীক্ষা, পেশাদার বোর্ড গঠন, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলককরণ ও প্রতি তিন মাসে আমদানির তথ্য উন্মুক্ত করা। ৫. ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করা। ৬. জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ প্রত্যাহার করা।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাজার অর্থনীতি বা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়, তবে জবাবদিহিহীন হস্তান্তর এবং লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টির বিরোধী। জাতীয় স্বার্থে জ্বালানি খাতের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।