যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব সিনেটরদের
হরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে শর্ত মানতে বাধ্য করতে চায় ইরান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ওমানের সাথে চুক্তি নয়, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে থ‘ইরানের শর্তাবলী পুরোপুরি মেনে নেয়ার’ ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এদিকে ‘অবৈধ ইরান যুদ্ধ’ বন্ধের একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন মার্কিন সিনেটররা।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজে’র বরাত দিয়ে আলজাজিরা বলেছে, আইআরজিসির মুখপাত্র সরদার মহেবি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়টি ইরানের ‘নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও শর্তের’ ওপর নির্ভরশীল, যার সাথে ওমানের চলমান আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই।
মহেবি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের কাছে হরমুজ প্রণালী কেবল একটি অর্থনৈতিক জলপথ নয়, বরং এটি আমাদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত ক্ষমতার একটি অংশ।’ মুখপাত্র আরো যোগ করেন, এই জলপথটি পুনরায় খুলে দেয়ার শর্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ইরানের শর্তাবলী পুরোপুরি মেনে নিতে হবে এবং আঞ্চলিক আলোচনায় হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেদিন ইরানের শর্ত মেনে নেবে, সেদিনই অবশ্যই হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হবে।
বস্তুত হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছে ইরান। দেশটির নেতৃত্বের ধারণা, সামরিক চাপ অব্যাহত রাখলে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে বাধ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মতে, সময়ও এখন তাদের পক্ষেই।
গালফ নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, কৌশলটির পেছনে ইরানের যুক্তি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্র, বিশেষ করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুদ কমছে। একইসাথে যুদ্ধটি মার্কিন জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী অনেকাংশে বন্ধ থাকলে গ্যাস ও অন্যান্য পণ্যের দামও উচ্চ থাকবে, যা নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
ইরানের হিসেব অনুযায়ী, জোর করে হরমুজ খুলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ব্যয় করতে হবে এবং সেখানে মার্কিন স্থলবাহিনীও পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হাউছিরাও যুদ্ধ আরো বিস্তৃত করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে বিঘœ ঘটাতে পারে। এসব বিবেচনায় ট্রাম্পের সামনে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না এমনটাই মনে করছে ইরান।
তবে ইরানের এই কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও ইরানেই এর আঘাত সবচেয়ে তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশটির শিল্পভিত্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন অবরোধে দেশটির তেল রফতানির বড় অংশ বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানিরা তিন অঙ্কের খাদ্য মূল্যস্ফীতির সাথে লড়ছেন। এ ছাড়া বেসামরিক অবকাঠামো, যেমন পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের হামলার হুমকিও বারবার দিয়েছেন ট্রাম্প।
তেহরানের একসময়কার প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের উপদেষ্টা আবদুর রেজা দাভারি বলেন, হরমুজের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে আলোচনায় তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুবিধা দিয়েছে। তিনি বলেন, হরমুজ থেকে রাজস্ব আয়ের চেয়ে ইরানের কাছে প্রণালীটির ব্যবস্থাপনা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রণালীটির অন্তত একটি অংশের ওপর আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইরানের জন্য বড় বিজয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরাজয় হিসেবে দেখা হবে। কারণ যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর কিছু এখনো অর্জিত হয়নি। ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষা ধার করে বলা যায়, ইরানের বিশ্বাস- তাদের হাতেই এখন তাস। ইরানের প্রধান আলোচকের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু এর সমাপ্তি কখন হবে তা তাদের হাতে ছিল না। ইরান নিজেই ঠিক করবে কখন যুদ্ধ শেষ হবে। তিনি জানান, ইরান কোনো চুক্তির জন্য নয়, শত্রুর পরাজয়ের জন্য এগোচ্ছে।
তিনি আরো দাবি করেন, জুলাইয়ে জর্ডানে ইরানের আকস্মিক হামলা তেলের দাম কমে যাওয়ার প্রভাব ‘পুষিয়ে দিয়েছে’। এর ফলে জুনে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেঙে পড়ে। ওই চুক্তিতে ইরানকে উল্লেখযোগ্য কিছু ছাড় দেয়ার প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় এবং আরও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি।
‘অবৈধ ইরান যুদ্ধ’ বন্ধে মার্কিন সিনেটরদের প্রস্তাব
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচালিত ‘অবৈধ ইরান যুদ্ধ’ বন্ধ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চকক্ষ সিনেটে একটি যৌথ রেজুলেশন পেশ করেছেন দেশটির সিনেটররা। খবর আলজাজিরার। গতকাল শনিবার মার্কিন সিনেটর জন হিকেনলুপারের এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বার্তার বরাতে এই পদক্ষেপের তথ্য সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক বার্তায় সিনেটর জন হিকেনলুপার লিখেছেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবৈধ ইরান যুদ্ধ থামানোর জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছি।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, এই যুদ্ধের কারণে আমেরিকানদের প্রাণহানি ঘটেছে, জ্বালানি তেল ও সারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং দেশের সামরিক অস্ত্রাগারের মজুদ খালি হয়ে গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে তিনি অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি জানান।
ট্রাম্পের সামনে তিন পথ
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যেখানে সামনে থাকা প্রতিটি পথই রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত তিনি একটি বড় ভুল এড়িয়ে চলেছেন। তা হলো, যুদ্ধকে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপক সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা। ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান আরো বাড়িয়েছেন। ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনা কমে যাওয়ার পরও সম্মান ও রাজনৈতিক চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আরো গভীরে জড়িয়ে পড়েছে। ইরান ইস্যুতেও এখন একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি ট্রাম্প। ইরান আত্মসমর্পণ বা অর্থবহ আলোচনায় না এলে তার সামনে মূলত তিনটি পথ রয়েছে। একটি হলো, কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও বিমান হামলা, নৌ অবরোধ ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির মতো বর্তমান কৌশল চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টি হলো, হামলার পরিধি বাড়িয়ে ইরানের অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত করা এবং সীমিত স্থল অভিযান শুরু করা। তৃতীয়টি হলো, বড় লক্ষ্যগুলো পূরণ না করেই যুদ্ধ থেকে সরে আসা। তবে তিন পথই কঠিন।