মোস্তফা কামাল
বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঢলসহ চলমান দুর্যোগ-দুর্বিপাক কতোটা প্রাকৃতিক আর কতোটা মানবসৃষ্ট, এ নিয়ে গণমাধ্যমের নানা বিশ্লেষণের দিকে তাকানোর অবকাশ নেই সশস্ত্র বাহিনীর। সেই চর্চা বা অভ্যস্ততাই নেই তাদের। জীবন ও সম্পদ রক্ষাসহ দুর্যোগ মোকাবিলায় যথারীতি সমন্বিতভাবে নেমে পড়া তাদের বৈশিষ্ট্য। যথারীতি স্থলে, জলে, সীমান্তেও এ কাজে নেমেও পড়েছে। এ জন্য তাদের তাগিদ দিতে হয় না। বড় রকমের হুকুমনামা জারি করতে হয় না। নতুন করে প্রস্তুতিও নিতে হয় না। এভাবেই তারা রপ্ত ও অভ্যস্ত।

বৈশিষ্ট্যের এ ধারাবাহিকতার কারণেই বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা, সাহস, দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনার বিশ্ব স্বীকৃতি। অনুকরণীয় মডেল হিসেবে পরিচিতি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের মানবিক সহায়তা মিশন এবং ত্রাণ ব্যবস্থাপনার প্রশংসা নিয়মিত করে চলছে। এ ধরনের স্বীকৃতি, কদর, প্রশংসা প্রকারান্তরে যোগ হচ্ছে বাংলাদেশ নামক দেশটির ঝুড়িতে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের সমন্বিত কাজ মানুষকে ভরসা জাগাচ্ছে। দেশের চলমান বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সরাসরি তদারকি করছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের নেয়া তাৎক্ষণিক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে: দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, পানিবাহিত রোগ ও সাপের দংশন মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন এবং ওষুধসহ মেডিকেল টিম মোতায়েন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যজীবী, গবাদিপশুর খামারি ও সাধারণ গৃহস্থদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া, পানি নেমে যাওয়ার পর দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা মেরামত ইত্যাদি।

অতি বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামে নগরে জলাবদ্ধতার পর এবার উপজেলাগুলোতেও জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। চরম দুর্ভোগে পড়া সেই চট্টগ্রামবাসীর পাশে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর কার্যক্রম নিজ চোখে না দেখলে কারো কারো বোধগম্য নাও হতে পারে। সেনাবাহিনী কতো দ্রুত গতিতে উত্তর চট্টগ্রামে বোয়ালখালী, হাটহাজারী এবং ফটিকছড়ির দুর্গম এলাকার দুর্গততের কাছে জরুরি ত্রাণ এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে, তা উপকারভোগীদের কাছেও তাজ্জবের। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ এলাকায়ও সেনাবাহিনী ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে। এর বাইরে হাজারেরও বেশি মানুষকে জরুরি চিকিৎসা সেবার আওতায় এনেছে সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিম। নৌবাহিনী পতেঙ্গার বিজয় নগর, আকমল আলী রোড, নিউ মুরিং মাদরাসা, নারিকেল তলা ও নেভি হাসপাতাল গেইট এলাকায় পানিবন্দি পরিবারগুলোর মাঝে প্যাকেট রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত চলবে নৌবাহিনীর এ কার্যক্রম।

সীমান্তে শত কাজের ব্যস্ততার মাঝে বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুরসহ মোট বন্যাকবলিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। এ ১১ জেলার শতখানেক পয়েন্টে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করছে বিজিবি। সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও মানবিক সহায়তাও দিচ্ছে। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ছুটে গেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া শত-শত মানুষের মাঝে রান্না করা উন্নতমানের খাবার দিয়েছে। করেছে সুপেয় পানির ব্যবস্থাও। নাইক্ষ্যংছড়িতে ভূমিক্ষয়ের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া স্টিলের সেতু রক্ষায় জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওই কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ দুর্গতরা। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিজিবি কর্মকর্তাদের দুর্গতদের খোঁজ-খবর নেয়ার ধরন, পানিবাহিত রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ চরম দিনে পরম পাওয়া। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এ মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে বিজিবির হাই কমান্ডের নেতৃত্বেরও। দুর্যোগ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীর এ বিশ্ব স্বীকৃতি একদিনে আসেনি। তা প্রশংসায় ভরিয়ে দেয়ার ‍স্তুতির কূটনীতিও নয়। পদে পদে, সময়ে সময়ে কাজের স্বীকৃতির স্মারক। বিশ্বশান্তি রক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষায় অনবদ্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কাজের ধরনকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে অনেক আগেই।

জাতিসংঘ মিশনে বিশ্বশান্তি রক্ষার পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জরুরি উদ্ধার, চিকিৎসাসেবা ও ত্রাণ তৎপরতাসহ মানবিক সেবার ধরন বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। এজন্য অসংখ্যবার জাতিসংঘ পদক ও সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের এ সন্তানদের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় বৃদ্ধির জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম মহড়া 'ডিজাস্টার রেসপন্স এক্সারসাইজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ' নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে আয়োজিত হয়, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বমঞ্চে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সফলভাবে জরুরি উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা মিশন পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত।

নিজ দেশে সিডর, আইলা, করোনা মহামারিসহ নানা দুর্যোগে জীবন বাজি রেখে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনায় তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে যার আরেক ঝলক দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনার এ কাণ্ডারিদের। ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সেনাবাহিনী দেশের যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় থাকে আগোয়ান থাকে বলেই তাদের কাছে ভরসা বেশি। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রায় সবার মাঝে যখন এক চিন্তা—কীভাবে বানভাসিদের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব- তখন ঠিকই জেগে উঠে বাংলাদেশ। মানবিকতার অনন্য নজির, অভূতপূর্ব ঐক্য ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।

দেশপ্রেম আর সর্বজনীন কল্যাণবোধের মানবিক গুণে উদ্ভাসিত হয়ে সৌহার্দ্য, সহানুভূতি, চিন্তাশীলতা আর ন্যায়বোধে সমহিমায় বলিয়ান হয়ে নেমে পড়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। তা শুধু বস্তুগত নয়, এক অনন্য আন্তরিক-মানবিক সংযোগও। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদে উদ্ধারের পাশাপাশি অভুক্তদের আহারের বন্দোবস্ত কিংবা বেঁচে থাকাদের সান্ত্বনা সবই রয়েছে তাদের কাজের ভলিউমে।

বাংলাদেশ বিশ্বে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম। উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হয়। ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশটিতে দুর্যোগ অনেকটা নিয়তির মতো। তা কখনো প্রাকৃতিক, কখনো মনুষ্যসৃষ্ট। সশস্ত্র বাহিনী সেই তফাৎ দেখতে যায় না। হোক প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দুর্যোগই তাদের কাছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সুগম করা। এ কঠিন বাস্তবতায় কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিন ধরেই এক অনন্য ও নির্ভরযোগ্য ভূমিকা। ভরসার জায়গাও। দেশে কোনো বড় দুর্যোগ দেখা দিলে দল-মত নির্বিশেষে মানুষের প্রথম প্রত্যাশাই থাকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের, যা এই বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।

ঘূর্ণিঝড় সিডর, বুলবুল কিংবা আইলার মতো দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যাপক ত্রাণ এবং উদ্ধার তৎপরতা দেশে দেশে পাঠ-পঠনের বিষয়। সাভার রানা প্লাজা ধসের মানবসৃষ্ট দুর্যোগ সামলানোর সেই চেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এখন্ও আসছে উদাহরণ হয়ে। রানা প্লাজা ধস চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল ৯ তলা ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১১৫ জন মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়। রানা প্লাজা ধসের পর সপ্তাহব্যাপী উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়।

দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা তাদের প্রধান দায়িত্ব হলেও, প্রয়োজনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা এবং জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ সর্বজনস্বীকৃত। দুর্যোগ মোকাবিলার এ কাজটি করতে গিয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রভাগে থাকে। ভবন ধস, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়াদের উদ্ধারে নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেনাবাহিনীর কর্মতৎপরতা বরাবরই সাহসের গৌরব গাঁথা। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে নৌযান, বিশেষায়িত অনুসন্ধান দল এবং আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে ছুটে যায় তারা। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিম আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, নিরাপদে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং প্রয়োজন হলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা সর্বদা নিজেদের প্রস্তুত রাখতে অভ্যস্ত হয়ে এখন ভরসার সমান্তরালে কাণ্ডারির ভূমিকায়। যার সর্বশেষ ছাপ এখন দেশের দুর্যোগপীড়িত এলাকায়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন