মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার পর পাকিস্তান ও ভারত ১০ মে একটি পরিপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। বর্তমানে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও পরমাণু শক্তির অধিকারী দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্ঘাতের মূল কারণ কাশ্মিরবিরোধ এখনো অমীমাংসিত।
যুদ্ধবিরতির প্রাক্কালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য মধ্যস্থতারও প্রস্তাব দিয়েছেন। পাকিস্তান এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে জোর দিয়ে বলেছে, যেকোনো নিষ্পত্তি বা মীমাংসা অবশ্যই জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হতে হবে এবং কাশ্মিরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে, ট্রাম্প কাশ্মির বিরোধকে শতাব্দীর প্রাচীন সমস্যা যার সমাধান সম্ভব নয় বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন করে সঙ্ঘাতের মুখে ট্রাম্পের গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং সঙ্কট সমাধানে সহায়তার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই প্রস্তাব ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তোলে, কারণ একতরফাভাবে এই অঞ্চলকে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করার পর ভারত কাশ্মিরকে একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং দীর্ঘদিন ধরেই মীমাংসিত ও সমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল। ভারত কাশ্মিরকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়মমাফিক প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এই অবস্থান সঙ্ঘাতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাবকে উপেক্ষা করে যেমনটি সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতে দেখা গেছে।
পাকিস্তান ট্রাম্পের হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ১৯৭২ সালে পাকিস্তান-ভারত স্বাক্ষরিত সিমলা চুক্তির গুরুত্বকে উপেক্ষা করেছে। চুক্তিটিতে বিরোধের দ্বিপক্ষীয় সমাধানের আহ্বান জানানো হয় এবং কাশ্মির দুই দেশের মধ্যকার একটি অমীমাংসিত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও কোনো পক্ষই আর চুক্তির কথা উল্লেখ করে না। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ওঠার ব্যাপারে আহ্বান জানাতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্য দিকে ভারত এটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। এভাবে কাশ্মির বিরোধ জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবসমূহ এবং সিমলার ভুলে যাওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভাসমান রয়েছে, এ ব্যাপারে জোরালো কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা নেই।
ভারত অব্যাহতভাবে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষা করে চলেছে। প্রথমত, কাশ্মিরের সাংবিধানিক মর্যাদা পরিবর্তনকারী ধারা ৩৭০ এবং ৩৫-ক, বাতিলের ফলে ভয়াবহ সঙ্ঘাত এবং বিদ্রোহ, ভিন্নমত বা স্বাধীকার আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। দ্বিতীয়ত, সিমলা চুক্তিকে স্বীকৃতি না দিয়ে ভারত কাশ্মিরকে একটি নিষ্পত্তিকৃত বিষয় হিসেবে গণ্য করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, উভয় পক্ষই অতীতের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে নৈতিকভাবে বাধ্য এবং এই বিরোধ এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ট্রাম্প শান্তির উপায় হিসেবে এবং উভয় দেশকে পরস্পর সম্পৃক্ত করার জন্য দুই দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বৃদ্ধির কথা বলেছেন এবং সংশ্লিষ্ট দু’টি দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখলেও পাকিস্তানকে এখনো সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টায় তাদের একটি প্রধান সহযোগী হিসেবে দেখে। পাকিস্তানকে গুরুত্ব না দিলে এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণ্ন্ন হতে পারে। এমনকি ভারত মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ওয়াশিংটন এখনো উভয় দেশকে তার কূটনৈতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে রাখার জন্য বাণিজ্যিক সুবিধাকে ব্যবহার করতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে ক্লিনটন, বুশ, ওবামা ও বাইডেনসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা কাশ্মির নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাকিস্তান সর্বদা প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও ভারত সব সময়ই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাম্প সম্ভবত ভারতের প্রত্যাখ্যানেরই প্রত্যাশা করেছিলেন, তবুও তিনি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাকিস্তান সদিচ্ছা দেখিয়েছে এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। এটিও এক ধরনের কূটনীতি।
ভারত ২০১৯ সালে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার মাধ্যমে কাশ্মিরের জনগণের ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করেছে। কাশ্মিরি জনগণ কখনো ভারতীয় ইউনিয়নে একীভূত হওয়ার দাবি করেনি এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সীমিত সার্বভৌমত্ব দেয়া থেকে ভারত আকস্মিকভাবে সরে আসার কারণে সেখানে অবশ্যম্ভাবী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তবুও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কাশ্মিরের ব্যাপারে অনেকটা নীরব ছিল এবং পাকিস্তান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ইস্যুটি কার্যকরভাবে উত্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফলে কাশ্মিরিরা ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা হ্রাসের পর পাকিস্তানের সামনে আবারো কাশ্মির ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ এসেছে। ট্রাম্পকে অবশ্যই তার প্রস্তাবে অটল থেকে ভারতকে তার অনমনীয় অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে সম্মত করানোর জন্য চাপ দিতে হবে। অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য ইস্যুটি রেখে না দিয়ে ট্রাম্পকে বিষয়টি নিয়ে এগোতে হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ট্রাম্প দু’টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলমান একটি পুরনো সঙ্ঘাতের অবসান ঘটিয়ে এই প্রক্রিয়ায় একটি নোবেল শান্তি পুরস্কারও হয়তো পেয়ে যেতে পারেন।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক দ্য নেশন
পত্রিকা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার