রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন-বিটিভি দেশের মানুষের কাছে আবেগের নাম। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যখন এই টিভি চ্যানেল যাত্রা শুরু করেছিল, তখন তার সাথে ছিলেন সেরা শিল্পী ও কলাকুশলীরা। বিটিভির অনুষ্ঠানের মান যেমন ছিল অতুলনীয়, তেমনি একটি মাত্র চ্যানেল হওয়ায় দর্শকপ্রিয়তাও ছিল আকাশচুম্বী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিটিভির এই জনপ্রিয়তা বিদ্যমান ছিল। এরপর দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেল হয়েছে, বিকল্প গণমাধ্যম সৃষ্টি হয়েছে; কিন্তু বিটিভি তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি। ফলে বেসরকারি টিভি চ্যানেল কিংবা বিকল্প গণমাধ্যমগুলো তরতর করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিলেও বিটিভি সেখান থেকে ছিটকে পড়ে যায়। এভাবে বিটিভির দর্শকপ্রিয়তা অনেকটাই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। আর আয়ে আসে ভাটা। সম্প্রতি বিটিভির আয় ও ব্যয়ের যে হিসাব তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সংসদে তুলে ধরেছেন তা বেশ অবাক করার মতো।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে কর-সহ বিটিভি আয় করেছে আট কোটি পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
তথ্যমন্ত্রী সংসদে বিটিভির মোট ছয় অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরেছেন। সেখানে গত কয়েক বছর ধরেই আয় ও ব্যয়ের মধ্যে এই আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখা গেছে। সংসদে শুধু বিটিভির হিসাব এলেও রাষ্ট্রের অন্য দু’টি গণমাধ্যম- বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসে যে একই অবস্থা বিদ্যমান তা বলাই বাহুল্য।
বিটিভির মতো একটি দর্শকপ্রিয় শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে কিভাবে এই অধঃপতন নেমে এলো এবং এর থেকে বের হওয়ার পথই বা কী- সে হিসাব কোনো সরকারই করে দেখেনি; বরং প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিভাবে বিটিভিকে নিজেদের প্রচারমাধ্যম হিসেবে বশে রাখা যায়, সে চেষ্টাই সর্বদা করে গেছে। শুধু তাই নয়, বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে সত্যিকারে একটি দর্শকপ্রিয় টিভি চ্যানেলে রূপান্তর করার জন্য নানা সময়ে উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার কিংবা বাসসের এমন লোকসানের অন্যতম কারণ- অধিক রাজনীতিকীকরণ, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি। এসব প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির লেশমাত্র নেই। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী যেমন চলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও তেমন করে চলেন। অথচ অতীতে এসব প্রতিষ্ঠানে এমনটি ছিল না। দেশের সেরা শিল্পী ও কলাকুশলীরা ছিলেন এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। যারা আজও সমাজের নানা স্তরের সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলছেন।
বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার কিংবা বাসসের মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের ভাবনার সময় এসেছে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা বছরের পর বছর জনগণের টাকা এসব প্রতিষ্ঠানে খরচ করে শুধু নিজেদের প্রচার চালিয়ে যাবে, নাকি সত্যিকারের গণমানুষের গণমাধ্যমে পরিণত করবে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বাইরে এনে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সম্প্রচার কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনের কাজ হবে এমন একটি পদ্ধতি বের করা, যার মধ্য দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান রাজনীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। প্রতিযোগিতামূলক গণমাধ্যমের এই যুগে কিভাবে সেরা অনুষ্ঠানটি দর্শকদের উপহার দেয়া যায়, সে দিকে বিটিভি কর্তৃপক্ষকে জোর দিতে হবে। বিটিভি এখনো তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। এর জন্য দরকার শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বিটিভি শুধুই সরকারের সম্প্রচার মাধ্যম না হয়ে একটি গণমানুষের প্রচারমাধ্যম হয়ে উঠুক, এমনটিই জনগণের প্রত্যাশা।