হিজরি বর্ষের পয়লা মাস মহররম। এটি শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক। মানব ইতিহাসে ১০ মহররম ঘটনাবহুল একটি দিন। তবে গত চৌদ্দ শ’ বছরে কারবালার বিয়োগান্ত ও মর্মন্তুদ উপাখ্যান আশুরাকেন্দ্রিক আলোচনায় মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে।
এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কারবালার সেই মর্মন্তুদ ঘটনা, যেখানে সত্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় ইমাম হুসাইন রা: এবং তাঁর সঙ্গীরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। তবু অত্যাচারী শাসকের অন্যায় চাওয়ার কাছে মাথানত করেননি। তাই বেইনসাফি ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রাণপণ সংগ্রাম করে যাওয়ার আহ্বান ও শিক্ষা হচ্ছে আশুরার প্রধান মর্মবাণী। এই দিনে ধর্মপ্রাণ মুসলিম সবাই আল্লাহতে সমর্পিত থেকে ইবাদতে মশগুল থাকেন। তাদের প্রত্যাশা, আল্লাহর রহমত ও বরকতের ফল্গুধারায় সিক্ত হওয়া।
ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করে সত্যকে সমুন্নত রাখার যে শিক্ষা হজরত ইমাম হুসাইন রা: দিয়েছেন, তা যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। তার আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়; কিন্তু সেই পথই মানবতার প্রকৃত পন্থা। কারবালার মতো করুণ উপাখ্যানগুলোতে অপরিমেয় ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকারের মধ্য দিয়ে ইসলামের অনুসারীরা তাদের আদর্শিক নবজীবন লাভ করেন। এভাবে যুগে যুগে ইসলামের অবিনশ্বর চেতনা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও কবি মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বলেছেন, ‘কতলে হুসাইন আসল মেঁ মর্গে ইয়াজিদ হ্যায়/ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কি বাদ।’ (হুসাইন রা:-এর হত্যাকাণ্ড আসলে ইয়াজিদেরই মৃত্যু, প্রতি কারবালার ঘটনার পরে ইসলাম প্রাণ ফিরে পায়)।
বর্তমান বিশ্বে যখন অন্যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি এবং নৈতিক অবক্ষয় দ্রুত ত্বরান্বিত করছে, তখন কারবালার শিক্ষা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আশুরা আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। আমরা কতটা ন্যায়পরায়ণ, কতটা মানবিক, কতটা সত্যনিষ্ঠ, এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় এটি। শুধু শোক প্রকাশ বা আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে আশুরার তাৎপর্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূল্য শিক্ষা হলো ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও সততার চর্চা করা। একই সাথে সংযম, ধৈর্য ও আত্মশুদ্ধিরও বার্তা বহন করে। তাই এ সময় আমাদের উচিত বিভেদ নয়, ঐক্যের চেতনা জাগ্রত করা এবং ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ সামনে আনা। কারবালার আত্মত্যাগ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি মানবতার জন্য সাহস, নৈতিকতা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য উপাদান।
সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে ইসলামকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়নের যথাসাধ্য প্রয়াসে আশুরা পালনের সার্থকতা নিহিত। যদিও আজ মুসলমানরা অনেকটা দিশেহারা। তাদের নিজেদের দুর্বলতায় পদে পদে লাঞ্ছিত-অপমানিত হচ্ছেন। এ দিন তারা শপথ নিতে পারেন ত্যাগের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের। শপথ নিতে পারেন মুসলমানরা কুরআনকে আঁকড়ে ধরার। এর মাধ্যমে অবমাননা ও লাঞ্ছনাকর জীবন থেকে তাদের উত্তরণ ঘটতে পারে।