শিক্ষকরা জীবনভর আলো জ্বেলে রাখেন। তাদের আলোয় আলোকিত হয় শিক্ষার্থীরা। যারা আলো জ্বেলে রাখেন, তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়টা আলোঝলমলে থাকবে- এমনটিই হওয়ার কথা; কিন্তু আমাদের দেশের বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) শিক্ষক-কর্মচারীদের সেই কপাল নেই। তারা যখন অবসরে যান, অবসর ভাতা পাওয়ার জন্য তাদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়। অনেকসময় সেই অপেক্ষা গড়িয়ে যায় মৃত্যু পর্যন্ত।

গতকাল নয়া দিগন্তের খবরে উল্লেখ করা হয়, অবসর ভাতার জন্য এখন ৮০ হাজারেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারী ধুঁকছেন। নিজেদের গচ্ছিত টাকা ফেরত পেতে দরজায় দরজায় ঘুরতে হচ্ছে তাদের। কখনো অপেক্ষা করতে করতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের। এর চেয়ে বড় সামাজিক ও মানবিক ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

তথ্য বলছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় ৯ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি রয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষক অবসরে যাওয়ার দুই থেকে পাঁচ বছর পরও প্রাপ্য বুঝে পাচ্ছেন না। গুরুতর অসুস্থতায় চিকিৎসা করাতে পারছেন না, ওষুধও কিনতে পারছেন না তারা। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।

অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের মূল অর্থায়ন আসে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদা থেকে; কিন্তু আবেদন ও দায়ের পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও তহবিলের আয় সে হারে বাড়েনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, কল্যাণ ট্রাস্টের বার্ষিক আয় প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা। ব্যয় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। এতে প্রতি বছর ঘাটতি হচ্ছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। এই ঘাটতির কারণেই অবসর সুবিধা দেয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সভায় এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অবসর সুবিধার বিপুলসংখ্যক আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় অসন্তোষ জানানো হয়।

এই দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের মধ্যে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আশার সঞ্চার করেছে। ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে অবসর সুবিধা আইন। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। শক্তিশালী করা হয়েছে অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাও। আবেদন যাচাই ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষকের পেনশনের টাকা দেয়া আগস্ট মাসে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রী বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে চলতি বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় দুই হাজার কোটি টাকার একটি বন্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব সুবিধা ধাপে ধাপে প্রায় দুই লাখ পেনশনভোগীর মধ্যে সম্প্রসারণ করা হবে।

আমরা মনে করি, এই আশ্বাসের শতভাগ বাস্তবায়ন জরুরি। সেই সাথে প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। এই উদ্যোগ যেন আলোর মুখ দেখার আগেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হারিয়ে না যায়। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।