জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সভ্যতা। যেকোনো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া মানে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন অচল হয়ে পড়া। এ জন্য সব দেশ জ্বালানি নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে। কিন্তু আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তায় নীতিনির্ধারকদের তেমন নজর আছে বলে মনে হয় না। থাকলে দেশীয় বা বৈশ্বিক কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলে জ্বালানি নিয়ে বিপাকে পড়তে হতো না। দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস সঙ্কট ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর। এর আগে ইরানে মার্কিন-ইসরাইল আগ্রাসনের পরপরই দেশে পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল নিতে লঙ্কাকাণ্ড বেধেছে।

গণমাধ্যমের খবর, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালু না হওয়ায় সারা দেশে গ্যাস সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সিএনজি ফিলিংস্টেশন, সর্বত্র গ্যাসের জন্য হাহাকার পড়ে। অন্য দিকে দিনে-রাতে গ্যাস না থাকায় ঢাকার বেশির ভাগ এলাকার বাসিন্দা রান্না করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, গ্যাস সঙ্কটে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। বৃষ্টির মধ্যেও বিভিন্ন জায়গায় লোডশেডিং দিতে হয়েছে।

মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউয়ের মেরামত শেষ হলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। শর্ট সার্কিট থেকে এফএসআরইউতে আগুন লাগলে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ দৈনিক ৪৫-৫০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। ফলে সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট। এতদিন সরবরাহ করা হয়েছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি ছিল ১১০ কোটি ঘনফুট। ভাসমান টার্মিনালে কোনো সমস্যা হলে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তখন গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসবে। এর বিকল্প কোনো কিছু এখনো দেশে নেই।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের নিম্নচাপ, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিএনজি ফিলিংস্টেশন নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা; অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতিতে। প্রশ্ন হলো- একবিংশ শতাব্দীতে এসে কেন জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা বারবার ফিরে আসছে?

আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার, জ্বালানি সঙ্কট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়। জ্বালানি সঙ্কটের পরিণতি হলো- শিল্পে উৎপাদন কমলে রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। এতে অনিবার্যভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। তাই গ্যাস-সঙ্কট একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কট।

জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস সঙ্কটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে ব্যাধ্য। এ সমস্যা মোকাবেলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানির বহুমুখীকরণ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে একই ধরনের সঙ্কট বারবার ফিরে আসবে। পাশাপাশি গ্যাস চুরি, সিস্টেম লস এবং অবৈধসংযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। তাই তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবেলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।