লেবাননে ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি ও আলোচনার মধ্যেই ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা
Printed Edition
আলজাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সঙ্ঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননজুড়ে আক্রমণ ও ধারাবাহিক বিস্ফোরণ অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার এক খবরে জানা গেছে, ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের আল-মানসুরি শহরে আক্রমণ চালিয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী মাজদাল জৌন গ্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার মাজদাল জৌনে হওয়া এই বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ ১৫ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত টায়ার শহর থেকেও স্পষ্ট শোনা গেছে। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে এ ধরনের হামলা ও অবকাঠামো ধ্বংস নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার নাবাতিয়ে আল-ফাওকায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে ইসরাইলি হামলায় দুই স্বাস্থ্যকর্মী আহত হন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নিয়মাবলির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইসরাইল মূলত সীমান্তসংলগ্ন পুরো গ্রামগুলোকে পরিকল্পিতভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। একটি তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করতে লেবাননের বিভিন্ন শহরকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার এই লক্ষ্যটির কথা ইসরাইলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছেন। গত ২ মার্চ থেকে সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল লেবাননের ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে এবং এসব হামলায় চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরাইল দাবি করছে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যাতে উত্তর ইসরাইলে কোনো আক্রমণ চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই তারা এই অভিযান পরিচালনা করছে। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের কৌশলটি গাজায় ইসরাইলের ব্যবহৃত কৌশলের সাথে হুবহু মিলে যায়, যেখানে কাগজ-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও সামরিক অভিযান থামাতে দেখা যায়নি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সমগ্র গাজা উপত্যকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলাই ইসরাইলের মূল লক্ষ্য।
রাজনৈতিক তৎপরতা ও বিতর্কিত রূপরেখা চুক্তি
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউজে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সাথে এক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো সময়সীমা নির্ধারিত আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, ইসরাইলি বাহিনী সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এবং তারা অন্যান্য এলাকায় নতুন করে সেনাদের পুনর্বিন্যাস করছে।
গত ২৬ জুন ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত রূপরেখা চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার শর্তে লেবাননের সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলের ইসরাইল অধিকৃত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য লেবানন ও ইসরাইলের প্রতিনিধিরা নিয়মিত বৈঠকে বসছেন, যার পরবর্তী পর্বটি আগামী ৪ আগস্ট ইতালিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ এই চুক্তিকে শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করেছে। গোষ্ঠীটির প্রধান নাঈম কাসেম চুক্তিটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর ঘোষণা করে লেবাননের মাটি থেকে ইসরাইলি বাহিনীকে বিতাড়িত করতে সশস্ত্র প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ও স্থানীয়দের অসন্তোষ
স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা রাখা হয়নি। এর বদলে দু’টি পরীক্ষামূলক অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে লেবাননের সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ও কার্যকর নিরাপত্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে লেবাননের সেনাবাহিনী প্রথম পরীক্ষামূলক অঞ্চলের গ্রামগুলোতে মোতায়েন হতে শুরু করেছে। তবে ফ্রুন ও গান্দুরিয়াহ এলাকায় ফিরে আসা স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন, তাদের গ্রামগুলো কখনোই সরাসরি ইসরাইলি বাহিনীর দখলে ছিল না। ফলে তাদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল প্রকৃতপক্ষে কোনো ভূখণ্ডই লেবাননকে ফেরত দেয়নি।