বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান স্বাধীনতার পর এক মর্মান্তিক স্মরণীয় ঘটনা। এ ঘটনায় যারা সামনে-পেছনে থেকে সম্পৃক্ত হয়ে সংগ্রাম চালিয়েছেন, শুধু তারাই ভালো করে বলতে পারবেন- জুলাই-আগস্টের এই গণ-অভ্যুত্থানের সময়টা কতটা কঠিন ও ভয়াবহ ছিল। এর বাইরে গণমাধ্যমে যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা দেখে যে কেউ রীতিমতো আঁতকে উঠেছেন, হতভম্ব হয়েছেন ও হবেন।

এমনি এক ঘটনা ঘটেছিল ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায়, ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন। এদিন পুলিশ মানুষকে শুধু গুলি করে হত্যাই করেনি, তাদেরসহ জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলারও দুঃসাহস দেখিয়েছিল! এমন নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশের শান্তিকামী মানুষ সেদিন স্তম্ভিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। এতে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফীসহ ১৬ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন তারা।

তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর বাইরে একজন গুলিতে গুরুতর আহত ছিল। সবাইকে প্রথমে একটি ভ্যানে এবং পরে পুলিশের একটি গাড়িতে তোলা হয়। পরে এই ছয়জনকে (একজন জীবিত) আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে। এদিন আশুলিয়ায় পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের গুলিতে অন্তত ৩১ জন ছাত্র-জনতা মারা যায়।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখার অন্যতম হাতিয়ার ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মরত তার অনুগত কিছু সদস্য। বিশেষ করে পুলিশ ও র‌্যাবের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে শেখ হাসিনা অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এমনভাবে খুনি করে তুলেছিলেন যে, তারা সব হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। যে কারণে পুলিশ শুধু গুলি করে মানুষ হত্যাই করেনি, তাদের পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলেছিল। ছাত্র-জনতাকে গুলি করে মেরে পুড়িয়ে ফেলার এই দায় শুধু পুলিশ ও ছাত্রলীগের-যুবলীগের নয়, এই দায় শেখ হাসিনাও এড়াতে পারেন না।

আমরা জানি না, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সেই সময়ে পুলিশ ও র‌্যাবের কারা এমন আরো নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। পুলিশ সংস্কার কমিশন ছাত্র-জনতার হত্যাকারী এসব পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যকে চিহ্নিত করলে ভবিষ্যতে এমন অন্যায় রোধের পথ সুগম করা যেত।

ছাত্র-জনতার ওপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তার বিচার আদৌ গণ-অভ্যুত্থানের পথ বেয়ে আসা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে হবে কি-না নিশ্চিত নয়। জাতীয় নির্বাচনের পর এই বিচারকার্যক্রমের কী হবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। অথচ শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন উৎখাত করতে বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দেয়া এসব সাহসী ছাত্র-জনতার হত্যার বিচার করাটাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর প্রধান অ্যাজেন্ডা হওয়া উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে অনেকের নিষ্ক্রিয়ভাব ক্ষতিগ্রস্তদের মনে কষ্ট জমাচ্ছে।

আমরা আশাবাদী। আমরা মনে করি, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার তার নিজ গতিতেই এগিয়ে যাবে। সরকারের পরিবর্তন হলেও বিচারের ক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। আমরা আশুলিয়ার ছাত্র-জনতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার কামনা করি। সেই সাথে এই বিচার সম্পন্ন করতে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলেও আশা রাখি।