সবে মাত্র কৃষক মাঠ থেকে ধান গোলায় তুলেছেন। ধানের এই ভরা মৌসুম শুরু হওয়া মানে মানুষের জন্য স্বস্তি। এ সময় বাজারে চালের সরবরাহ বাড়বে, দামে স্থিতি থাকবে, এটি স্বাভাবিক; কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কাজ করে ‘সিন্ডিকেট’ অর্থাৎ দুষ্টচক্র। এই দুষ্টচক্র বাজারে তৈরি করে রাখে কৃত্রিম সঙ্কট।
এখন বাজারে চালের কোনো ধরনের সঙ্কট থাকার কথা নয়; কিন্তু সক্রিয় হয়ে উঠেছে মিল সিন্ডিকেট। এতে দাম বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। বিশেষ করে সরু চাল মিনিকেট ও নাজিরশাল– এই দুই জাতের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারা পড়েছেন বিপাকে।
সহযোগী একটি দৈনিকের খবর, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মিল পর্যায়ে ৫০ কেজির বস্তায় মিনিকেট চালের দাম ২৫০-৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। রাজধানীর বাজারগুলোতে সাধারণ ক্রেতাকে প্রতি কেজিতে তিন থেকে ছয় টাকা বেশি দিয়ে চাল কিনতে হচ্ছে। চাল যেহেতু দেশের প্রধান খাদ্য, তাই এর বাড়তি মূল্য নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জীবনমানে তীব্র প্রভাব ফেলে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে প্রকৃত কোনো ঘাটতির চিত্র দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা স্বীকার করছেন, বাড়তি দাম দিলে চাহিদামতো চাল পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে সুযোগ নেয়া হচ্ছে। তবে মিল মালিকদের একটি অংশ যুক্তি দিচ্ছে, এবার ধানের সরবরাহ কম। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা ও মৌসুমি সময় বিবেচনায় এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তদারকির দুর্বলতায় মিলাররা বাড়তি মুনাফা লুটতে চাইছেন, এটা স্পষ্ট।
সুতরাং প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী? এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বলছে জনবল সঙ্কটের কথা। কিন্তু চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এ অজুহাত গ্রহণ করার মতো নয়। ‘সিন্ডিকেট’ বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি ‘নিয়মিত ব্যাধি’। পরিবর্তিত বাংলাদেশে এই ‘ব্যাধি’র নিরাময় হবে বলে আশা করেছিল সাধারণ মানুষ। এ ক্ষেত্রে সরকারে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি না থাকলে সিন্ডিকেট আরো বেপরোয়া হবে, এতে খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। প্রথমত, মিল পর্যায়ে কঠোর নজরদারি দরকার। সাথে চালাতে হবে অভিযান। দ্বিতীয়ত, ধান ও চালের প্রকৃত মজুদ পরিস্থিতি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। এতে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির সুযোগ কমে আসবে। তৃতীয়ত, সিন্ডিকেট প্রমাণ হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি খাদ্য মজুদ এবং ‘ওএমএস’ কার্যক্রম জোরদার করলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
চালের বাজারে অস্থিরতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন। ভরা মৌসুমেই যদি এভাবে অতি প্রয়োজনীয় পণ্য চালের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সামনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই এখনই সময়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে চালের বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে এনে মানুষের ন্যায্য অধিকারের সুরক্ষা দেয়ার।