আমাদের দেশে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে কাজের ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি যেন একটি স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এর প্রধান ভুক্তভোগী হন সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিবাসী। তবে জনদুর্ভোগ যত তীব্র হোক না কেন, তা দূর করতে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থাকে উদাসীন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক তেমন একটি উন্নয়ন প্রকল্প।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে (মূল চার লেন ও দুই পাশে দুই লেন সার্ভিস রোড) উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। একাধিক প্যাকেজে বিভক্ত প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে; কিন্তু এই পর্যন্ত কোনো কোনো প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে ১০-১৫ শতাংশ। তাই বাস্তবতা হলো, কোনো অবস্থাতে এ প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজের ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ২১৩ কিলোমিটার স্থান এখন দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেই সাথে বেড়েছে জনদুর্ভোগ। অনেক স্থানে প্রকল্পের কাজ কার্যত থমকে আছে। নরসিংদী, ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে রাস্তার একপাশ খুঁড়ে মাসের পর মাস ফেলে রাখা হয়েছে। সার্ভিস লেনের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় বর্ষায় কাদা ও শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। খোঁড়াখুঁড়িতে সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকছে। এ ছাড়াও সড়কের বেজ নির্মাণে নির্ধারিত মানের পরিবর্তে নিম্নমানের ইটের খোয়া ও স্থানীয় বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্মাণস্থলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী বা সওজের তদারকি কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকায় ঠিকাদাররা ইচ্ছামতো কাজ করছেন।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের কাজে ধীরগতির অন্যতম কারণ জমি অধিগ্রহণ জটিলতা। প্রকৃত বহু মালিক ভূমির ক্ষতিপূরণ না পেলেও ভুয়া স্থাপনা দেখিয়ে অনেকে টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আবার ভূমি অধিগ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বাজার দরের চেয়ে স্বল্পমূল্যে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে বেরিয়ে এসেছে, মহাসড়ক নির্মাণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ দেশে পরিণত হয়েছে। এ দেশে প্রতি কিলোমিটার চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণব্যয় শত কোটি টাকা বা এর চেয়ে বেশি। পাশের দেশ ভারত তো বটেই, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণব্যয় কয়েক গুণ বেশি। তাই এ কথা বলা যায়, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের নামে আমাদের দেশে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার সময় বাকি আছে আর মাত্র বছরখানেক। এ দিকে কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে অর্ধেকের বেশি। এমতাবস্থায় প্রকল্পটির পুরো কাজ নির্ধারিত সময়ে যে শেষ হবে না, তা সহজে অনুমেয়। কিন্তু জনদুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। মহাসড়কের যেসব স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি আছে সেখানে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা অত্যাবশক হলেও তা করা হয়নি। দুঃখজনক হলো– সড়ক খুঁড়ে কাজ বন্ধ রাখা শুধু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নয়, সারা দেশে এই দৃশ্য বিদ্যমান। এর পুনরাবৃত্তি রোধে কর্তৃপক্ষ সবসময় গাফেল।
আমরা মনে করি, জনদুর্ভোগ লাঘবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়নকাজ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে নজর দেবে।