পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু সেই পানি যদি পানের উপযোগী, জীবাণুমুক্ত বা নিরাপদ না হয় তাহলে এর মাধ্যমে জীবননাশের শঙ্কা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। পানি নিরাপদ না হয়ে দূষিত ও ময়লা হলে এতে পানিবাহিত রোগ টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়া চর্মরোগ ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়ে। অন্য দিকে স্যানিটেশন বা পয়ঃপ্রণালী, পয়োনিষ্কাশন পদ্ধতি, টয়লেট ইত্যাদি যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকে, সেখান থেকেও নানা প্রকার সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায়। দুই ক্ষেত্রে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ শৌচাগার ব্যবহার ও নিরাপদ পানি পান, এই ছোট ছোট অভ্যাস শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং একটি সচেতন জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রোগপ্রতিরোধী জীবনধারার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। অথচ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি, এই তিন মৌলিক পরিষেবা একসাথে পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’-এ এসব বিষয় উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার সংস্থাটি নিজস্ব ওয়েবসাইটে উল্লিখিত জরিপ প্রকাশ করেছে।

জরিপ অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি, এই তিন সুবিধা একসাথে রয়েছে। বাকি ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসব মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শহরের চেয়ে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সঙ্কট প্রকট।

শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, রোগ প্রতিরোধ এবং একটি সচেতন জাতি গঠনে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিনের বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথচ আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের বাইরে রয়ে গেছে। এটি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠদান বা গ্রহণ শিক্ষা নয়। শিক্ষা হচ্ছে দেহ, মন ও সামাজিক বোধে একটি সুসমন্বিত উন্নয়ন। এই উন্নয়নে প্রয়োজন উন্নত স্যানিটেশন ও হাইজিন মানে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি একটি সভ্য দেশের পরিচায়ক এবং শিশুর সুস্বাস্থ্যে অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়।

নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সুবিধার মধ্যে পড়ে। বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে বলে তাদের এই পরিষেবা নিশ্চিত করা অবশ্যকরণীয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি তাদের শরীর-মনে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় গমনে নিরুৎসাহিত হয়। অনুপস্থিতির হার বাড়ে।

নানা সময়ে বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়; কিন্তু বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও স্যানিটেশন সুবিধার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয় না। ফলে এ সময়ে এসেও আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশে এই সুবিধার অভাব প্রকট। বিষয়গুলো আরো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে সরকারের উচিত মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুততার সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।