প্রতিরক্ষা নিয়ে মোটা মোটা বই আছে। আছে ভারী ভারী থিউরি। সার্বভৌমত্ব নিয়ে লেখা আছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। সীমান্ত কিভাবে সামাল দিতে হয় তা নিয়েও লিখে রেখেছেন বিশেষজ্ঞরা; কিন্তু জামালপুর অথবা চাঁপাই সীমান্তের মানুষরা কি এসব লেখা পড়েছেন? ‘আদর্শ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা’ বা এমন শিরোনামের কোনো বই কি তাদের পাঠ্য ছিল?

কোনো থিউরি পড়ে পুশইন ঠেকাতে যাননি সীমান্তের মানুষ। তারা গিয়েছেন নিজস্ব তাড়না থেকে। তারা জানেন, বাংলাদেশ তাদের। এই মাটি রক্ষার দায়িত্বও তাদের। এ কারণে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে জনতা। স্বতঃস্ফূর্ত এ প্রতিরোধে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিএসএফ সদস্যরা। রাতের আঁধারে হেডলাইট নিভিয়ে গাড়িভর্তি লোক নিয়ে আসে বিএসএফ। প্রতিরোধের মুখে পুশইন করতে না পেরে ইঞ্জিনের ধোঁয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়।

যে দেয়াল ভেদ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় প্রশিক্ষিত বাহিনী, সেই দেয়ালকে আমরা কী নামে ডাকব? তাদের কি জনবাহিনী বলা যায়?

এবার যদি কিছুটা তত্ত্ব-সত্য ঘেঁটে দেখি, তাহলে ‘জনবাহিনী’ শব্দটা একটু ভারী হয়ে যায়। একটি বাহিনী হতে হলে ধরাবাঁধা কিছু নিয়ম থাকতে হয়। মানতে হয় কেতাবি বিধিনিষেধ। কিন্তু সবনিয়ম ছাপিয়ে জনতার এই বাহিনী গড়ে তুলেছে অভূতপূর্ব প্রতিরক্ষা।

একাত্তরে যখন যুদ্ধ ছিল, তখন লাঙল ফেলে তুলে নেয়া হয়েছিল থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। তখন পাকিস্তান সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে মুক্তিবাহিনী। এখন যুদ্ধ নেই, ‘শান্তি’ আছে। তাহলে জনতার কোনো বাহিনী দরকার হবে কেন? কিন্তু জনতা যে সীমান্তে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, এটা তো সত্য। দা, কুড়াল, খুন্তি নিয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। এই পাহারা দেয়া, দেশকে আগলে রাখা- এসবের কি কোনো নাম নেই?

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা হয়তো বলবেন- নাম আছে, তবে ‘জনবাহিনী’ নয়। তাদের বলা যায় ‘স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক প্রতিরোধ’। অথবা ‘কমিউনিটি বর্ডার ওয়াচ’। বিশেষজ্ঞরা বলবেন, এখানে আনুষ্ঠানিক কমাণ্ড নেই, কারো শরীরে উর্দি নেই। তাই একে কোনো বাহিনী বলা যাবে না। উর্দির চাইতে জনশক্তির প্রতিরোধ যে কম কিছু নয়, সেই সত্যটাও বেরিয়ে আসে বিশেষজ্ঞদের থেকে।

বাংলাদেশের সীমান্তের প্রতি ইঞ্চিতে কি বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন রাখা সম্ভব? কিন্তু এই প্রতি ইঞ্চি মাটির সাথে জড়িয়ে আছে সীমান্তের মানুষ। পাতাঝোপ ভেঙে একটা ‘সাপ’ গড়িয়ে গেলেও টের পেয়ে যান তারা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিএসএফের অবস্থান জানিয়ে দিয়ে আসেন বিজিবির কাছে। আগাম তথ্যের এই নেটওয়ার্ক রাডারের চেয়েও দ্রুত কাজ করে। এরা ‘কমিউনিটি ইন্টেলিজেন্স’।

প্রশিক্ষিত একটি সামরিক বাহিনী অন্য একটা প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিপরীতে ছক এঁকে নিতে পারে; কিন্তু পুরো জনপদ লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে সব ছক এলোমেলো হয়ে যায়। লাঠি হাতে ‘জনবাহিনী’র মুখ থেকে ছুটে যায় বুলেটের মতো স্লোগান। জনতার প্রতিরোধের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় অস্ত্রের দেমাগ।

ভিয়েতনামে ঝাঁকে ঝাঁকে সেনা আর যুদ্ধবিমান নামিয়েও জনতার দেয়াল ভাঙতে পারেনি মার্কিন বাহিনী। নাগরিকরা সেখানে সৈনিক হয়ে উঠেছিল। দিনে ধানের জমিতে কাজ করতেন যিনি, রাতে তিনি হয়ে উঠতেন গেরিলা। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণ করে রাশিয়া। ধারণা করা হয়েছিল, এক মাসের মাথায় জয় নিয়ে ঘরে ফিরে যাবেন পুতিন; কিন্তু এখনো জয় অধরা রয়ে গেছে। কারণ ইউক্রেনে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ফোর্সেস’। স্কুলের শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকাররা এসব ফোর্সে নাম লিখিয়েছিলেন।

সুইজারল্যান্ডে স্থায়ী ও পেশাদার সেনাবাহিনীই নেই। তাদের আছে ‘মিলিশিয়া সিস্টেম’। প্রত্যেক সক্ষম নাগরিককে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সিভিলিয়ান জীবনের পাশাপাশি দেশরক্ষায় প্রস্তুত থাকতে হয় তাদের। ইসরাইলের সিভিলিয়ানদেরও সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়।

আসলে জীবন্ত প্রাচীর যতটা সুরক্ষা দিতে পারে, কাঁটাতারের বেড়া আর অস্ত্র সেখানে অসহায়। বাংলাদেশকে ঘিরে আগলে রেখেছে জনতার প্রাচীর। আমাদের সাথে সীমান্ত আছে ভারতের, আর মিয়ানমারের। ভারতের দিক থেকে আসছে পুশইন। আসছে চোরাচালান। মিয়ানমার সীমান্তে জান্তার সাথে লড়াই করছে আরাকান আর্মি। আছে ভারী অস্ত্রের ঝনঝনানি, মর্টার শেলের পতন। বারুদঠাসা সীমান্ত সামাল দেয়া জনতার কাজ নয়। তারপরও সীমান্ত নিরাপদ রাখতে জনতার দরকার হয়।

মিয়ানমার সীমান্তে দালাল ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে জনতাকে সক্রিয় করে তোলা সম্ভব। জনতার চোখ দিয়েই দেখে নেয়া সম্ভব উপকূলীয় পরিস্থিতি। নাফ নদ কিংবা টেকনাফ উপকূল দিয়ে অনুপ্রবেশের পেছনে আছে সিন্ডিকেট। এই দুষ্টচক্রের সদস্যদের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে তুলে দিলে অনুপ্রবেশের পথ সেখানে সরু হয়ে যাবে।

তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে- আবেগের এই প্রতিরোধে যেন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া না হয়। বিজিবির সাথে বোঝাপড়া থাকতে হবে তাদের। না হয় বড় ধরনের কূটনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়ে যেতে পারে। তবে জনতার এই আবেগ, এই প্রতিশ্রুতিকে আরো টেকসই করতে ভাবা যেতে পারে একটু অন্যরকম করেও।

আনসার বা গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো গড়ে তোলা যেতে পারে ‘সীমান্ত প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’। তাদের কাজ হবে টহল দেয়া। অস্বাভাবিকের খবর বিজিবিকে পৌঁছে দেয়া।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

smmoshahid@gmail.com