(প্রথম কিস্তি)
ওমরাহ ও হজ ব্যবস্থাপনায় সৌদি সরকার ব্যাপক পরিবর্তনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো দূর করে সার্বিক প্রক্রিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট ও একক নীতিমালায় নিয়ে আসাই এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। হাজীদের কোরবানি, আবাসন, খাদ্য সরবরাহ এবং আন্তঃনগর পরিবহন (জেদ্দা, মক্কা ও মদিনা) সরাসরি সৌদি সরকারের অধীনে বা তাদের নিবন্ধিত একক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। হজ এজেন্সিগুলোর প্রথাগত ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে। তারা প্রধানত নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে হাজী নিবন্ধন বা সংগ্রহের কাজে যুক্ত থাকবে। পর্যায়ক্রমে বিমানের টিকিট ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সরকারের নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর অধীনে চলে যাবে।
অতীতে অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু এজেন্সির অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা অব্যবস্থাপনার কারণে হাজীদের যে ভোগান্তিতে পড়তে হতো, সেখান থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে চাচ্ছে সৌদি সরকার। হজ ও ওমরাহ খাতকে বিশ্বমানের আধুনিক পর্যটন ও সেবা শিল্পের আদলে গড়ে তোলা, যাতে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের অ-তেলভিত্তিক অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সরাসরি নিবন্ধন চালু করে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থার ফলে এজেন্সির নির্ভরতা কমবে, খরচসংক্রান্ত স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিশ্বজুড়ে হজযাত্রীদের সার্বিক সেবা আরো সহজ ও সুশৃঙ্খল হয়ে উঠবে।
সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য হলো শৃঙ্খলা, পূর্ণ জবাবদিহিতা ও সেবার মান নিশ্চিত করা। শতাধিক ছোট ও অনিবন্ধিত বা অনভিজ্ঞ এজেন্সির সাথে পৃথকভাবে সমন্বয় করা প্রশাসনিকভাবে জটিল। তাই এজেন্সি সংখ্যা কমিয়ে বড় ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তারা বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দিচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে হজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর কর্মদক্ষতা ও সেবার মানে সুস্পষ্ট দু’টি চিত্র দেখা যায়-
বেশ কিছু এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সাথে সেবা দিয়ে আসছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন, মক্কা-মদিনায় উন্নত আবাসন এবং সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে তারা হাজীদের সর্বোচ্চ আস্থা অর্জন করেছে।
বিপরীতপক্ষে কিছু এজেন্সি সৌদি সরকারের বেঁধে দেয়া সময়সীমা (ডেডলাইন) তোয়াক্কা না করে বাড়ি বা তাঁবু ভাড়ায় বিলম্ব করে, যার ফলে হাজীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাদের পারফরম্যান্সে সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।

‘ফতরা’ পদ্ধতিতে হাজীদের ভোগান্তি
হাজীদের শুরুতেই নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী হোটেলে না রেখে প্রথমে হারাম শরিফ বা মসজিদে নববীর কিছুটা কাছে (যেমন- মিসফালা, হিজরাহ রোড, আজিয়াদ, মারকাজিয়া) রাখা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের সরিয়ে দূরবর্তী এলাকায় (যেমন- আজিজিয়া বা বেলাল মসজিদের নিকটবর্তী এলাকা) স্থানান্তর করা হয়। কম খরচে সাময়িক আবাসন ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা। এটিই ‘ফতরা’ পদ্ধতি। সৌদি সরকার এটি পছন্দ করে না। এর ফলে প্রবীণ ও অসুস্থ হাজীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্লান্তি ও কষ্টে পড়েন। সৌদি সরকারের প্রস্তাবিত নতুন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা ও একক নীতিমালার মাধ্যমে এ ধরনের ‘ফতরা’ সংস্কৃতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ম পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে, যা সাধারণ হাজীদের জন্য স্বস্তিদায়ক।
লাইসেন্স ধরে রাখার বাণিজ্যিক প্রবণতা
বাংলাদেশের তিন শ’-চার শ’ এজেন্সি টানা তিন বছর কোনো হাজী পাঠায়নি। লাইসেন্স আঁকড়ে রাখার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য হলো লাইসেন্সটিকে একটি ‘স্থাবর সম্পদ’ বা ‘ট্রেডিং অ্যাসেট’ হিসেবে ব্যবহার করা। অনেক ক্ষেত্রে এসব লাইসেন্স ভবিষ্যতে চড়া দামে বিক্রি বা হস্তান্তর করা, কোটা কেনাবেচা করা কিংবা এজেন্সির নাম ভাঙিয়ে ভিন্ন কোনো ব্যবসায়িক সুবিধা নেয়ার জন্য টিকিয়ে রাখা হয়।
দেড় শতাধিক এজেন্সি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেয়নি। এতে স্পষ্ট নির্দেশ করে, খাতটিতে তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভাব আছে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কঠোরতার ঘাটতি থাকায় এজেন্সিগুলোর মধ্যে এই উদাসীনতা ও আইন অমান্যের মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-হাব মূলত একটি ব্যবসায়ী সংগঠন। সব সদস্যের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব হলেও নিস্ক্রিয় বা অনিয়মে যুক্ত এজেন্সিগুলোকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা সার্বিক হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। এতে করে সুনামধন্য এজেন্সিগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সার্বিকভাবে দেশের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শত শত লাইসেন্সধারী এজেন্সি কাগজপত্রে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর এজেন্সির সংখ্যা কম। ফলে সৌদি সরকারের সাথে কোটা ও চুক্তিসংক্রান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়।
সৌদি সরকারের অসন্তোষ
সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরে এজেন্সির সংখ্যা কমিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট, দক্ষ ও শক্তিশালী কাঠামোর আওতায় আনার তাগিদ দিচ্ছে। বাংলাদেশে নিষ্ক্রিয় এজেন্সির এই বিশাল বহর সেই সংস্কারের পথে বড় বাধা। এ ধরনের স্থবিরতা ও অনিয়মের কারণেই মূলত সৌদি সরকার ২০২৭ সাল থেকে হজ ব্যবস্থাপনাকে নিজেদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী ও অকার্যকর এজেন্সির ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায়।
সৌদি আরবে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি আছে। জেদ্দা বা মদিনা বিমানবন্দরে তল্লাশির সময় বাংলাদেশী হাজীদের লাগেজে এসব নিষিদ্ধ পণ্য ধরা পড়লে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। এতে সাধারণ সৎ ও নির্দোষ বাংলাদেশী হাজীদেরও বিমানবন্দরে অতিরিক্ত তল্লাশি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
অনেক বয়োবৃদ্ধ ও গ্রাম্য হাজী এসব আইন বা পণ্যের ধরন সম্পর্কে সচেতন থাকেন না। অসাধু এজেন্সি বা তাদের এজেন্টরা হাজীদের ওপর বাড়তি মালামাল বা উপহারের নামে কৌশলে এসব নিষিদ্ধ বস্তু (যেমন- জর্দা, তামাক, অবৈধ ওষুধ) চাপিয়ে দেয়। বিমানবন্দরে কোনো অঘটন ঘটলে সম্পূর্ণ দায়ভার এসে পড়ে ওই সরলপ্রাণ হাজীর ওপর, যা তাকে আইনি জটিলতা ও জেল-জরিমানার ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
সৌদি আরবে তামাকজাত দ্রব্য বা নির্দিষ্ট কিছু কৃত্রিম ওষুধের কালোবাজারি দর অনেক বেশি। কতিপয় অসাধু এজেন্সি মালিক বা কর্মচারী হজের মতো পবিত্র সফরকে অবৈধ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এটি আইনগত অপরাধের পাশাপাশি চরম ধর্মীয় অবমাননা।
হজ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ
প্রতি বছর বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে কমবেশি ২০ লাখ মুসল্লি সৌদি আরবে সমবেত হন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সৌদি সরকারের জন্য যেমন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ, তেমনি বিভিন্ন মুসলিম দেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ প্রায় ১৫০ জন চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্টের সমন্বয়ে একটি মেডিক্যাল মিশন পাঠায়। তাদের সাথে এক কোটি টাকার প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীও পাঠানো হয়। এসব মেডিক্যাল সেন্টারে হাজীদের সাধারণ রোগের চিকিৎসা, স্বাস্থ্যপরামর্শ এবং জরুরি সহায়তা দেয়া হয়। জটিল রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সৌদি আরবের বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।
এই ব্যবস্থার বড় সুবিধা হলো- বাংলাদেশী হাজীরা নিজের ভাষায় চিকিৎসকের সাথে কথা বলতে পারেন। ভাষাগত সমস্যা কমে, রোগীর চিকিৎসা-ইতিহাস বোঝা সহজ হয় এবং মানসিক স্বস্তিও বাড়ে। বিশেষ করে প্রবীণ হাজীদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বাংলাদেশ মেডিক্যাল মিশনে অনেক সময় পর্যবেক্ষণের জন্য রোগীকে কিছু সময় রাখতে চাইলেও দ্রুত সৌদি হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ আসে। এর একটি কারণ হতে পারে- হজ মিশনের মেডিক্যাল সেন্টারগুলো মূলত প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত; সেখানে দীর্ঘ সময় রোগী পর্যবেক্ষণ, ভর্তি রাখা বা জটিল চিকিৎসা পরিচালনার সুযোগ ও অনুমতি সীমিত। অন্যদিকে সৌদি হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত। ফলে রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এটি প্রশাসনিক নীতি, চিকিৎসাগত নিরাপত্তা কিংবা দায়বদ্ধতার কারণেও হতে পারে। যদি ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও সম্পূর্ণভাবে সৌদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, বিভিন্ন দেশকে আর পৃথকভাবে শত শত চিকিৎসক, নার্স ও বিপুল ওষুধ পাঠাতে হবে না। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আর্থিক ব্যয় কমবে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কমবে।
দ্বিতীয়ত, সব হাজী একই মানের চিকিৎসা-প্রটোকল, একই ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং একই ধরনের চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে সমন্বয় ও তথ্য ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত হতে পারে।
তবে এর সাথে কিছু গুরুতর প্রশ্নও যুক্ত রয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হলো- হজ মৌসুমে প্রায় ২০ লাখ বা তারও বেশি হাজীর জন্য প্রয়োজনীয় হাসপাতাল, শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি চিকিৎসা অবকাঠামো কি পর্যাপ্ত আছে? যদিও সৌদি আরব প্রতি বছর হজ উপলক্ষে অস্থায়ী হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাজার হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করে, তবুও চরম ব্যস্ততার সময়ে এই সক্ষমতা আরো কতটা সম্প্রসারণ প্রয়োজন, তা নিয়মিত মূল্যায়নের বিষয়।
দ্বিতীয়ত, ভাষাগত সমস্যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, আফ্রিকা কিংবা মধ্য এশিয়ার বহু হাজী আরবি ভাষা জানেন না। নিজ দেশের চিকিৎসক না থাকলে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার ইতিহাস ব্যাখ্যা এবং পরামর্শ বোঝার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তৃতীয়ত, জাতীয় মেডিক্যাল মিশন শুধু চিকিৎসা দেয় না; তারা রোগীকে মানসিক সাহস জোগায়, পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে, প্রয়োজনে অনুবাদে সহায়তা করে এবং সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই মানবিক ভূমিকার বিকল্প কেবল হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে পূরণ করা সহজ নয়।
সুতরাং ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার দায়িত্ব থাকবে সৌদি সরকারের আধুনিক হাসপাতালগুলোর ওপর, আর বিভিন্ন দেশের মেডিক্যাল মিশন সীমিত পরিসরে প্রাথমিক চিকিৎসা, ভাষাগত সহায়তা, রোগী সমন্বয় এবং মানবিক সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করবে। এতে এক দিকে সৌদির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার দক্ষতা বজায় থাকবে, অন্য দিকে হাজীরাও নিজ দেশের প্রতিনিধিদের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
হজের চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যয় সাশ্রয় নয়; প্রতিজন হাজীর জন্য সময়মতো, নিরাপদ, সহজলভ্য ও মানবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক সহায়তার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের হজ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সর্বোত্তম পথ হতে পারে। এই বিশ্লেষণটি একটি নীতিগত ভারসাম্য তুলে ধরে- এক দিকে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয়করণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ, অন্য দিকে বিভিন্ন দেশের হাজীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা।
মুয়াল্লিম সিস্টেম থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
হজ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে মক্কা ও মদিনার ঐতিহ্যবাহী মুয়াল্লিম পরিবারগুলোর হাতেই বিদেশী হাজীদের সেবার মূল দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। উসমানীয় খেলাফতের শেষ যুগ থেকে শুরু করে সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও এই ব্যবস্থা বহাল ছিল। বহু মুয়াল্লিম পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভিন্ন দেশের হাজীদের সেবা দিয়ে এসেছে।
প্রতিটি দেশের হাজীদের জন্য নির্দিষ্ট মুয়াল্লিম প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করত। বাংলাদেশ (আগে পূর্ব পাকিস্তান), পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের হাজীরা নির্দিষ্ট মুয়াল্লিমের অধীনে থাকতেন। হাজীদের বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করা, আবাসনের ব্যবস্থা, মিনা ও আরাফাতে তাঁবু বরাদ্দ, পরিবহন, হারিয়ে যাওয়া হাজীদের খোঁজ, বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার সমাধান এবং হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে সহযোগিতা- সব কিছুই ছিল তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
(দ্বিতীয় কিস্তি আগামীকাল)
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।