বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির অবস্থানের কারণে এমনিতেই এ অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার সিন্ধু কবিতায় বলেছেন :

‘হে ক্ষুধিত বন্ধু মোর, তৃষিত জলধি,

এত জল বুকে তব, তবু নাহি তৃষার অবধি।

এত নদী উপনদী তব পদে করে আত্মদান,

বুভুক্ষু! তবু কি তব ভরিল না প্রাণ?

সুরা নাই-পাত্র-হাতে কাঁপিতেছে সাকি।’

জাতীয় কবির সেই ক্ষুধিত বন্ধু, সে তৃষিত জলধি, উপকূলবাসীর জীবন তছনছ করতে যার চিত্ত যেন বেশি আনন্দিত। বলা নেই, কওয়া নেই যখন তখন সে উত্তাল হয়ে ওঠে। তার মনপবনের ঠিকানা বাংলাদেশের আবহাওয়া দফতরও খুঁজে পায় না। সুন্দরবন তার পাগলামি বরাবরই মাথা পেতে নেয়। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, বরগুনা ও পটুয়াখালীকে শেল্টার দিলেও তার তাণ্ডবনৃত্যে প্রায়ই পাথরঘাটা, কুয়াকাটা, ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, মনপুরা, উড়ির চর, সোনাগাজী, মিরসরাই, ছাগলনাইয়্যার মতো অরক্ষিত উপকূল লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। আবার কখনো দক্ষিণ-পূর্ব দিগন্তে আনোয়ারা, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকোরিয়া ও কক্সবাজার উপকূল বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। এ অরক্ষিত উপকূলকে উপদ্রুত রাখা বা করাতেই যেন তার তৃপ্তি। ১৭৯৭ সাল থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের আইলা পর্যন্ত সময়ের শুমার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মোট ৪৭৮ বার মাঝারি ও মোটা দাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, আইলা ও নার্গিসরা বাংলাদেশের উপকূল ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে পাঁচ-দশ বছর পরপর, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৫৩ বছরে ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে, যা ছিল ঘন ঘন ও মহাপ্রলয়ঙ্কারী। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সর্বশেষ সিডর ও আইলার আঘাতে স্বয়ং সুন্দরবনও পর্যুদস্ত হয়েছে। ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের মহাপ্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস লাখ লাখ উপকূলবাসীর জীবন কেড়ে নিয়েছে। একটি বড় ও একটি মাঝারি ধরনের সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতির তুলনামূলক চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো :

বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকা উপকূলবেষ্টিত। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে গড়ে ১৩৫০ জন মানুষ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০ বছরে অন্তত ৬৪ বার মনে রাখার মতো বড় ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। ফলে কুতুবদিয়া-মহেশখালীসহ সমুদ্র উপকূলে জনগণকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বর্তমান আধুনিক যুগেও সেখানে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জনগণ পাচ্ছে না উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পাচ্ছে না নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা। এখানে নেই পর্যাপ্ত ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নেই কোনো ভালো চিকিৎসার সুযোগ। উপকূল রক্ষার বেড়িবাঁধের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত সমুদ্রের জোয়ারের পানি ভেতরে প্রবেশ করে প্রতি বছরই জনগণের আর্থসামাজিক কাঠামো লণ্ডভণ্ড করে দেয়। সাইক্লোনের আগাম সতর্কতায় উপকূলবাসীকে কখনো কখনো সবকিছু গুটিয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নতুনভাবে জীবনযুদ্ধে নামতে হয় তাদের।

ঘূর্ণিঝড়ের নাম : ভোলা ঘূর্ণিঝড় (১৯৭০) তারিখ : ১২ নভেম্বর ১৯৭০ সর্বোচ্চ বাতাসের গতি : ১৮৫ কিমি/ ঘণ্টা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ : আনুমানিক $৮৬.৪ মিলিয়ন প্রাণহানি : ৩,০০,০০০, ৫,০০,০০০ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা : তজুমদ্দিন, ভোলা, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী
ঘূর্ণিঝড়ের নাম : ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় তারিখ : ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ সর্বোচ্চ বাতাসের গতি : ২৫০ কিমি/ ঘণ্টা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ : আনুমানিক $১.৭ বিলিয়ন প্রাণহানি : ১,৩৮,৮৬৬ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা : কুতুবদিয়া, মহেশখালী, বাঁশখালী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম

ঘূর্ণিঝড়ের নাম : ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭) তারিখ : ১৫ নভেম্বর ২০০৭ সর্বোচ্চ বাতাসের গতি : ২৬০ কিমি/ ঘণ্টা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ : আনুমানিক $২.৩১ বিলিয়ন প্রাণহানি : ৩,৪৪৭-১৫,০০০ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা : বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, খুলনা, সুন্দরবন

অবহেলিত উপকূলের জনগোষ্ঠী চিংড়ি চাষ, লবণ চাষ, পান চাষ, শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ, সামুদ্রিক মাছ ধরা, নৌকা তৈরি, পর্যটনসহ নানা পেশায় জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছে অদম্য সাহস ও কর্মস্পৃহা। অধিকাংশ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ও উপকূলে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন নির্বাহ করে। অথচ তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে।

এ দিকে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের উৎপাদন ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। মহেশখালীতে নির্মাণ হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বৃহত্তর কনটেইনার টার্মিনাল। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। পর্যটন খাতের বেশির ভাগ অবদান কক্সবাজার জেলা থেকে আসে। কক্সবাজার জেলা ও বাঁশখালী উপজেলার লবণ উৎপাদন বাংলাদেশে শতভাগ লবণের চাহিদা পূর্ণ করে। চিংড়ির মোট জাতীয় উৎপাদনের বেশির ভাগ কক্সবাজার জেলায় উৎপাদন হয়। ব্লু-ইকনোমি কক্সবাজার এলাকায় অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এতদসত্ত্বেও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূল বেড়িবাঁধবিহীন, অরক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে কুতুবদিয়া উপজেলার চার পাশে ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ কখনোই নির্মাণ হয়নি। ফলে কুতুবদিয়া দ্বীপের আয়তন গত ৬০ বছরে ৫০% কমে ১২৫ বর্গকিলোমিটার থেকে ৬২ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। মহেশখালীর ধলঘাটা ও মাতারবাড়ীতে ১৯৯১ সালের ভয়াভহ ঘূর্ণিঝড়ের পর একাধিক ওয়ার্ড সমুদ্রে হারিয়ে গেছে। বর্ষা শুরুর অগেই লোকালয় ও ফসলের মাঠে জোয়ারের পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

অধিকন্তু কুতুবদিয়াসহ কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব মোকাবেলার যথাযথ প্রস্তুতির বিশেষ করে পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের অভাব রয়েছে। কক্সবাজার উপকূলের জনগণ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বাস্তব ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের মতো শক্তিশালী কোনো ঘূর্ণিঝড় হলে উপকূলীয় উপজেলাগুলোয় বিশেষ করে কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে জনজীবন ও জীবীকার ওপর বিপর্যয় নেমে আসবে।

আসন্ন বর্ষা শুরুর আগে অবিলম্বে বেড়িবাঁধ মেরামত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার জন্য আমি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে ডিও লেটার দিয়ে জোর দাবি জানিয়েছি। উপরোক্ত পরিস্থিতির আলোকে উপকূলের জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আসন্ন বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই বেড়িবাঁধ মেরামত, পাশাপাশি অনতিবিলম্বে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রত্যাশা করে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য সামুদ্রিক দুর্যোগে প্রাণ হারানো সব মানুষের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য